২৪ ঘন্টাই খবর

ইবলিশ শয়তানের ধোঁকা ও শয়তান থেকে বাঁচার উপায়!

মোঃ রাব্বি সাহিদি সারোয়ার হোসেন
পঞ্চগড়।
শয়তান সম্পর্কে কি আপনাদের কোন ধারনা আছে?
জানি সবাই বলবেন হ্যা আছে।
সবাই জানে শয়তান হচ্ছে আযাযীল নামক একজন জিন।
যে একসময় আল্লাহর এতো পরিমান আনুগত্য ছিলো যে আল্লাহ পাক তার ইবাদত বন্দেগীতে খুশি হয়ে আযাযীলের সম্মান অধিষ্ঠিত করেছিলেন সুমহান মর্যাদায়।সে শ্রেষ্ঠ চারজন ফেরেশতাদের দলে পঞ্চম হিসেবে জিন হওয়া সত্বেও ছিলো এবং সে ছিলো সকল ফেরেশতাদের প্রধান ও ওস্তাদ,তারপর আদম আঃ কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ পাক যখন আদমকে সিজদা করার জন্য হুকুম করেছিলেন তিনি সিজদা করেননি বিধায় আযাযীল হতে অভিশপ্ত ইবলিস শয়তান হয়ে জান্নাত হতে বিতাড়িত হয়েছে,তাকে জান্নাত হতে বহিষ্কার করা হয়েছে,সে হয়েছে পদে পদে লাঞ্চিত ও বিতাড়িত।
তারপর সে হয়েছে আদম আঃ এর শত্রু এবং তারপর সে অনেক ষড়যন্ত্র করে আদম আঃ এবং বিবি হাওয়াকে জান্নাতের নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ায়,
যার ফলস্বরুুপ আদম আঃ ও বিবি হাওয়া অপরাধী হয়ে আল্লাহর দরবারে গিয়ে মাফ চায় এবং আল্লাহ পাক তাদের ক্ষমা করে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন।
আর শয়তান সেই অতীত হতে বর্তমানে নানান অপকর্ম সাধন করছে।
কি এটাই তো জানেন তাই না?
আসলে উপরোক্ত পরিচয়টি আযাযীলের বাহ্যিক পরিচয় হলেও তার অন্তর্নিহিত পরিচয় অত্যন্ত নিগুড়।
আসুন তাহলে আজকে জেনে নেই কে এই ইবলিশ শয়তান।
সম্মানিত পাঠক আপনারা যারা এতক্ষণ হতে আমার এই লেখাটি পড়ছেন সকলে আমার সালাম নিবেন,
আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহী ওয়া বারকাতুহু,
আপনারা জানেন যে শয়তান যখন জান্নাত হতে বিতাড়িত হয় তখন থেকে সে জান প্রাণ দিয়ে প্রচেষ্টা করতো (সম্মানিত পাঠক আমি চাইলে এখানে শয়তানকে সম্মানসূচক সমন্ধোন করতে পারতাম কিন্তু শয়তানের প্রতি সেই শ্রদ্ধা জানানোটা আমি নিষ্প্রয়োজন মনে করছি) কিভাবে আদম আঃ কে ও তার সন্তানদের পথভ্রষ্ট করতে হবে।
মূলত শয়তান ছিলো একজন আলেম ও সর্ববিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাই সে ভালোভাবে জানতো আদম সন্তানকে পথভ্রষ্ট করতে হলে শক্তি ও সময় দুটোরই দরকার,
তাই সে আল্লাহর দরবারে কেয়ামত পর্যন্ত জীবন ভিক্ষা চেয়ে আল্লাহকে বলেন;
“হে আমার রব,আমায় কেয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিন!
(উত্তরে দয়ালু আল্লাহ তাআলা) বললেন,
“আচ্ছা তোমাকে অবকাশ দেওয়া হলো”
রেফারেন্স-সুরাঃছোয়াদ,৭৯-৮০.
শয়তান কেয়ামত পর্যন্ত আয়ু পেয়ে এবার আবার আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন সুপ্রিম পাওয়ারের জন্য,
সে আল্লাহকে বললেন;
“হে আমার রব!
আমি অনবরত আক্রমন চালাবো আদম ও আদম সন্তানের উপর,তাদের সামনে ও পিছনের দিক হতে,তাদের ডান ও বাম দিক হতে।
আল্লাহ পাক তার সেই দোয়াও কবুল করলেন তবে খাটি বান্দাদের সে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না এই শর্তে।
হাদিস শরীফে আছে শয়তান একাই,একই সময়ে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের শিরায় উপশিরায় এবং প্রত্যেক স্থানে তার অভিযান চালাতে সক্ষম।
এমনকি সে মানুষের অন্তরেও কুমন্ত্রণা দেওয়ার মতো সুপ্রিম পাওয়ার অর্জন করেছেন আল্লাহ পাকের কাছে।
আল্লাহ পাক শয়তানকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রদান করার পর তাকে বলেন;
“হে শয়তান! মনে রাখবে, আমি অবশ্যই জাহান্নাম পরিপূর্ণ করবো তোমাকে এবং তোমার অনুগামীদের দ্বারা।”–সুরাঃ ছোয়াদ ৮৫।
তাহলে চিন্তা করুন শয়তান কতো ক্ষমতাধর এবং কতো কুচক্রী।
সে আল্লাহর সাথে চ্যালেঞ্জ করে যে সে আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করবে।
আল্লাহ পাক ক্ষমাশীল তিনি পাপী বান্দাদেরকেও ক্ষমা করেন যদি সে তওবা করে।
তার একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত আদম আঃ ও বিবি হাওয়ার নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার অপরাধ।
তবে কেউ যদি চালাকি করে তবে আল্লাহ পাক ছাড় দেন না।
ধরুন আপনি শয়তানের চক্রান্তে একটি মেয়েকে জিনা করার নিয়ত করলেন আর মনে মনে বললেন আল্লাহ তো দয়ালু তাই আমি মেয়েটিকে ধর্ষন করে তওবা করবো,এমনটি হবেনা।
মূলত আল্লাহ পাক ছাড় দেন ঠিকই তবে ছেড়ে দেন না।
• শয়তান চাইলে যে কাউকে তার অনুগামী ও অনুসারী বানাতে পারে তবে মুমিন বান্দাদের ছারা।
• শয়তান এমন চক্রান্ত করে যে আপনি ধরতেও পারবেন না,
সে চাইলে আপনার বন্ধুর সুরত ধরে আপনার কাছে এসে আপনাকে ফুসলিয় ফাসলিয়ে অপকর্ম করাতে পারে।
সে একই সাথে আপনার বন্ধু সেজে আপনাকে উস্কানি দিবে এবং আপনাকে সেই মুহুর্তে কুমন্ত্রণা দিবে।
সে যেকোন প্রাণীর সুরত ধরতে পারে।
সে জিনদেরকেও বশে এনে মানুষের ক্ষতি করাতে পারে।
• শয়তান ঈমাণদার ব্যক্তিদেরকেও ধোকা দেয়।
তাদেরকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফযরের নামাজ কাযা করায়।
• একদা ইবলিশ শয়তান এক আল্লাহর ওলীকে ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফযরের নামাজ কাযা করায়,সেই আল্লাহর ওলী যখন বুঝতে পারলেন সে অনেক দেরীতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়েছেন তখন তিনি কাযা নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে ক্রন্দন করেন,এতে আল্লাহ পাক খুশি হয়ে তার কাযা নামাজের সওয়াব চারগুন বেশি বাড়িয়ে দেন।-সুবহানাল্লাহ!
এতে শয়তান ঘাবড়ে যান এবং ভাবেন না একে তো কুমন্ত্রণা দেওয়া যাবে না,
কারন সে চারগুন বেশি সওয়াব পাচ্ছে,সে হিংসায় জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়।
তারপর হতে শয়তান নিজ দায়িত্বে সেই আল্লাহর ওলীকে ফযরে জাগিয়ে দেয়।
• শয়তান এতোই খারাপ যে সে স্বামী-স্ত্রীর মনেও সন্দেহের বীজ বপন করে সেই সংসারকে নরকে পরিণত করে।
• শয়তান দুজন ছেলেমেয়ে একসাথে থাকলে তাদের উভয়ের মনে কামভাব জাগিয়ে দেয়।
• শয়তান নির্দিষ্ট সময়ে তার সকল অনুগামীদের সাথে কাউন্সিলিং করে।
তাদের শয়তানি কাজের জন্য প্রতিদানস্বরুপ সম্মাননা প্রদান করে,
তাদের মোটিভেশন দেন।
• শয়তান যেহেতু জ্ঞাণী তাই সে সকল বিষয়ে অবহিত যে কিভাবে মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে হবে।
বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগ।
তাই শয়তান মানুষদের ধোঁকা দিয়ে অনলাইনে পর্ণগ্রাফী ছেরে সবাইকে চোঁখের গুনাহ করায়।
মোবাইলে মিথ্যা কথা বলাতে সাহায্য করায়,
অনেকসময় দেখা যায় কেউ চা দোকানে বসে আছে আর তাকে কেউ ফোন দিলে বলে আমি তো বাড়িতে বা অমুক জায়গায়।
এই যে মিথ্যা বলালো সেটা হলো কবিরা গুনাহ!
যেই গুনাহ তওবা ছাড়া কবুল হয় না,
যেই একটি গুনাহ আপনাকে কোটি কোটি বছর জাহান্নামে পুড়ানোর জন্য যথেষ্ট।
আমরা অনেকসময় দেখি গ্রামে কেউ হঠাৎ করে অজ্ঞান বা অসুস্থ্য হয়ে উল্টাপাল্টা কাজ বা কথাবার্তা বলে,সকলে বলে লোকটিকে ভুত ধরেছে।
আসলে ভুত বলতে দুনিয়াতে কিছুই নেই,
সেটা হচ্ছে শয়তানেরই কাজ।
শয়তানের অনুগামী শয়তান জিনেরা এ কাজ করে থাকে।
অনেকে জাদু টোনা করে কাউকে বিপদে ফেলে,এটাও শয়তানের কাজ।
শয়তান একজন মানুষকে কুমন্ত্রনা দিয়ে তাকে জাদুটোনা করার উৎসাহ দেয় যা শিরকী,
আবার শয়তানের মাধ্যমে সেই যাদুগ্রস্ত লোককে বিপদে ফেলে।
শয়তান মানুষকে ধৈর্যহারা করে তুলে।
জীবনে দুঃসময় আসবে এটা স্বাভাবিক,কিন্তু শয়তান এই দুঃসময়ে মানুষকে এতো বেশি কুমন্ত্রনা দেয় যে সেই মানুষটি কখনো কখনো আত্নহত্যা করে,বিষ খায়,গলায় ফাঁস টানে।
• শয়তান মানুষকে এতো বেশি ধোঁকা দেয় যে সেই মানুষটি অনবরত পাপ কাজ করতেই থাকে।
রমজান মাসে শয়তান শৃঙ্খলিত থাকে তারপরও অনেক মানুষ কেন রোজা রাখে না জানেন?
ঐ যে বললাম শয়তান মানুষকে এতো বেশি ধোঁকা দেয় যে মানুষ শয়তানের শয়তানিকে দৈনন্দিন নেশায় পরিনত করে নেয়,যার ফলস্বরুুপ সেই ব্যক্তির অন্তরে শয়তানের শয়তানি দীর্ঘদিন বিরাজ করে,এবং মানুষ রোজা রাখে না,নামাজ পড়ে না।
• শয়তান মানুষের মনে এতো বেশি কুমন্ত্রনা দেয় যে মানুষ ভালো কাজ না করে খারাপ কাজ করে,নামাজ পড়ার নিয়ত করলেও শয়তানের পাল্লায় পরে নামাজে উদাসীন হয়।
আবার যারা শয়তানের কুমন্ত্রনাকে পরাজিত করে নামাজে দাড়ায় । শয়তান তাদেরকেও ধোঁকা দেয় নামাজে।
আপনি যখন নামাজে দাড়ান তখন লক্ষ্য করবেন দুনিয়ার বিভিন্ন চিন্তাভাবনা মাথায় আসে,
এই কাজটি করে শয়তান।
শয়তান আপনাকে কুমন্ত্রনা দিতেই থাকবে যে এটা স্মরণ করো,ওটা স্মরণ করো, আর আপনি যখন সেই কথাগুলো স্মরণ করবেন তখন ভুলে যাবেন কয় রাকাত নামাজ পরেছেন।
অথবা তাশাহুদের জায়গায় সুরা ফাতিহা পড়বেন,অথবা রুকুতে গিয়ে সিজদার তাসবিহ পাঠ করবেন,সিজদায় গিয়ে রুকুর তাসবিহ পাঠ করবেন, অথবা বিতরের নামেজে দোয়ায় কুনত না পড়েই রুকুতে যাবেন ইত্যাদি।
শয়তান বিভিন্ন এজেন্টদের সহায়তা করে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে।
সে বিভিন্ন সংস্থাকে সুদি কারবারে সহায়তা করে। অশ্লীল টিভি সিরিয়াল বানাতেও শয়তানের হাত আছে।
যারা সেই সমস্ত সিরিয়ালের নির্মাতা তাদেরকে শয়তান কুমন্ত্রনা দিয়ে এসব তৈরী করাতে উৎসাহ দেন।
শয়তান একই সাথে দর্শক,অভিনেতা ও নির্মাতা।
•একজন মানুষের যখন মৃতু সন্নিকটে চলে আসে এবং সাকলাদ শুরু হয়,
তখন তার পরিবার পরিজনেরা তাকে কালেমার তালকীন দেয়,যাতে সেই ব্যক্তিটি কালিমা পাঠ করতে করতে ইন্তেকাল করেন,কিন্তু শয়তান সেই সময়েও ধোঁকা দেন!
শয়তান তখন সেই মৃতপ্রায় ব্যক্তিকে বিভিন্ন কথা স্মরণ করিয়ে দেয়,
তার প্রিয়জন যারা মারা গেছে তাদের সুরত ধরে শুধুমাত্র তাকে দেখা দেয় আর সমন্ধ ধরে বলে (যদি বাবা-মা মারা যায়) বাবা খবরদার কালিমা পাঠ করিও না,আজ আমাদের খুব ভয়ঙ্কর পরিণতি এই কালিমা পাঠ করে মারা যাওয়ার জন্য।
একজন মানুষ শয়তানের মাধ্যমে সর্বশেষ এই ধোকাটি খায়,তবে যারা মুমিন মুসলমান তারা শয়তানকে চিনে ফেলে,এবং কালিমা পাঠ করে।
তবে অধিকাংশ মানুষই কালিমা না পড়েই মারা যান যা চরম একটি বোকামি।-মৃত্যূকালের কালিমার ওসীলাতেও আল্লাহ অনেককে মাফ করে দেন,কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় অনেকে এই সুযোগটাও হারায়।
শয়তান যে কোন জিনিসের প্রতি আপনাকে আকর্ষিত করতে পারে।
শয়তান মানেই চিটার,বাটপার,ঠক ও ভিলেন।
সুতরাং শয়তান হতে পানাহ চেয়ে সর্বদা পাঠ করবেন “আউযুবিল্লাহী মিনাশ শাইত্বনীর রযীম”
অথবা ” লা হাওলা ওয়ালা ক্বুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”
সবসময় জিকির আজকারে নিজেকে মশগুল রাখবেন।
মনে সবসময় তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি রাখবেন।
শয়তানের ধোঁকায় পরে কোন অপকর্ম করলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা পাঠ করে সেই কাজ আর কখনো করবেন না,
কারো গীবত বা পরনিন্দা করবেন না।
মিথ্যা কথা কিংবা কারো সামনে চাপা মারবেন না।
সদাসর্বদা আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেন এতে শয়তান কিংবা শয়তান জিনেরা আপনার ধারেকাছে সহজে আসতে পারবে না।
বেগানা দৃষ্টি দিবেন না।
মনেপ্রাণে আল্লাহকে ডাকবেন।
তবেই আপনি আস্তে আস্তে শয়তানকে পরাজিত করতে পারবেন!
আল্লাহ পাক সবাইকে ইবলিশ শয়তান হতে রক্ষা করে আমাদের সহজ ও সরল পথে পরিচালিত করুক আমিন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.