২৪ ঘন্টাই খবর

ঈদুল আজহা আসন্ন: অনিশ্চয়তার মুখে ৫০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য।

 


ঈদুল আজহা আসন্ন: অনিশ্চয়তার মুখে ৫০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

 

রমজান আলী ঢাকাঃ

 

 

 

 

করোনার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এমনিতেই থমকে রয়েছে। করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় কঠোর লকডাউনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। এর মধ্যে আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশু ও মশলার বিশাল বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ দেশে বছরে যে পরিমাণ পশুর চামড়া পাওয়া যায় তার ৮০ শতাংশই আসে কোরবানি পশুর চামড়া থেকে।

 

এছাড়া মশলার সবথেকে বড় বেচাকেনাও ঘটে এ সময়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে কোরবানি ঈদ বড় ধরনের ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু গত বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া বিশ্ব মহামারি করোনা সেই বাজারকে অনেকটাই স্তিমিত করে দিয়েছে। এবার সবচেয়ে বড় আর্থিক লেনদেনের উৎসব ঈদুল আজহার বিশাল বাণিজ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। শুধু পশুই নয়, চামড়া শিল্প, ফ্রিজ-রেফ্রিজারেটর, ফ্যাশন, মশলাসহ ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

খামারি, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ঈদুল আজহায় বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে ১ কোটি ২০ লাখের মতো পশু। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে খামারি ও ব্যবসায়ীরা চরম শঙ্কা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন গুণছেন। একইভাবে দিন গুণছেন, ট্যানারি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী, মসলা, ফ্যাশন, ইলেক্ট্রনিক্স ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা সামলানো প্রত্যেকের জন্যই রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।

 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি রোধে লকডাউন জরুরি। তবে এর কারণে বিশাল এ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বড় ক্ষতি পুষিয়ে উঠা সম্ভব হবে না। তবে ব্যবসায়ীদের দিকে তাকিয়ে ঈদের সময় লকডাউনকে একটু শিথিল করতে হবে। লকডাউন শিথিল না হলে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ব্যাপাকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা তারা কোনভাবে কাটিয়ে উঠতে পারবে না যদি সরকার এদের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনার ব্যবস্থা না করে। এজন্য সরকারকে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি মানুষের হাতে নগদ টাকা সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, এবারে কোরবানির জন্য ১ কোটি ১৯ লাখ ১৭ হাজার পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ লাখ গরু ও ৭৩ লাখ ছাগল-ভেড়া। সারা বছর বিনিয়োগ ও কায়িক শ্রমে কোরবানির জন্য এসব পশু বড় করেছেন খামারি ও কৃষকরা।

 

করোনার কারণে অনেকের আয় কমে গেছে। মধ্যবিত্ত অনেকেই যারা বরাবর পশু কোরবানি দেন, এবার তারা নাও দিতে পারেন। এতে পশু বিক্রি কম হলে পশুর দামও কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে খামারিদের মধ্যে। একই সঙ্গে সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনের ঘোষণায় এ অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে তাদের মধ্যে। সাধারণত ঈদের প্রায় এক মাস আগে থেকেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটগুলোতে নিয়মিত বেপারি-ফড়িয়াদের আনাগোনা শুরু হয়। ঈদের ১৫ দিন আগে এটি পুরোপুরি জমে উঠে। মানুষ সশরীরে হাটে গিয়ে পছন্দ করে পশু কিনে থাকে। শুধু পশু কেন্দ্রিকই ৩৫-৪০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কোরবানির হার অনেক কমে যাবে, একই সঙ্গে কমবে এটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনীতির অন্যান্য খাতের স্বাভাবিকতাও। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে চামড়ার ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবছর দেশে দেড় কোটিরও বেশি পশুর চামড়া পাওয়া যায়। এর প্রায় ৮০ শতাংশই আসে কোরবানির পশু থেকে।

 

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ খাতের মূল বাজার ৪-৫ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বাজারসহ এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিশাল এ অর্থনীতির বড় ক্ষতির পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত কয়েক লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে তাদের দাবি।

 

 

 

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ ভোরের পাতাকে বলেন, করোনার কারণে চাহিদা না থাকায় ট্যানারিগুলোতে এখনই ৫০০-৬০০ কোটি টাকার চামড়া জমে রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে নতুন করে চামড়া কেনা কঠিন হবে ট্যানারি মালিকদের।

 

চামড়ার মতো কোরবানির আরেক বড় বাজার পেঁয়াজ-রসুনসহ গরম মশলার বাজার। প্রতিবছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। রসুনের চাহিদা ৫ লাখ টন, আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে গরম মসলা, বিশেষ করে এলাচি, দারচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার বড় অংশ ঈদের রান্নায় ব্যবহৃত হয়। কোরবানি ঈদেই এসব পণ্যে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

 

গত বছরও দেশে করোনার আঘাতের মধ্যেই কেটেছিল ২০২০ সালের ঈদুল আজহা। অর্থনীতির বিশাল কর্মযজ্ঞকে সামনে রেখে তখন লকডাউন কিছুটা শিথিল করেছিল সরকার। মার্কেট-শপিংমল খুলে দেওয়ার পাশাপাশি গণপরিবহনও চলে সীমিত পরিসরে। তবুও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ লাখ পশু কম কোরবানি হয় ২০২০ সালে। আর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম বিক্রি হয় ২৫ লাখ পশু।

 

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এক কোটি ১৯ লাখ পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর মধ্যে কোরবানি হয় ৯৪ লাখ। গত বছর ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। তবে এবছর আরো বড় ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.