২৪ ঘন্টাই খবর

মুন্সীগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুইশ’ঘর নিয়ে মানুষের মনে হাজারও প্রশ্ন ।

মুন্সীগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুইশ’ঘর নিয়ে মানুষের মনে হাজারও প্রশ্ন

 

মুন্সীগঞ্জ প্রতি‌নি‌ধিঃ

 

মুন্সীগঞ্জে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০০ ঘর নির্মাণে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ভূমিহীনরা যে ঘর পাবেন তা নিয়ে মুন্সীগঞ্জ সদরের বর্তমান ও সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দ্বন্দ্বে উঠে এসেছে ঘর তৈরিতে নিন্মমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করার। এ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ মুন্সীগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০০ ঘর নির্মাণে অনিয়মের চলমান তদন্তের মধ্যেই নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ না করে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান প্রকল্প এলাকা ত্যাগ করার জন্য হুমকি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।

 

ইতোমধ্যে ঘর নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব হোসেন।

 

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা পাওয়ার পরই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দীপক কুমার রায়কে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

 

 

সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলের আধারা ইউনিয়নের কালিরচর (ভাসানচর) এলাকায় রাস্তার পাশেই সবুজে ঘেরা আশ্রয়ণ প্রকল্প-২। এর আওতায় ২০০ ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই কাজের তদারকি করছেন চিতলিয়া ভূমি অফিসের সহকারী নায়েব মো. শরীফ মিয়া। প্রকল্পের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পথে। তবে, কোন ঘরের কাজই সমাপ্ত হয়নি। এরই মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

 

জানা গেছে, রুবায়েত হায়াত শিপলু গত বছরের ১২ জুলাই মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। কাজটির তদারকি দেন ঠিকাদার আবুল কালাম আজাদ মুন্সিকে। তার চাকুরির ৯ মাসের মাথায় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মুন্সীগঞ্জে চলে আসেন হামিদুর রহমান। তাকে সরিয়ে নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমানকে মুন্সীগঞ্জে আসার কয়েকদিন পর গত ২০ এপ্রিল দায়িত্ব ছেড়ে শিপলু মুন্সীগঞ্জ ছেড়ে চলে যান। দায়িত্ব একটু দেরিতে পাওয়ায় মনোক্ষুন্ন হন নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান।

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পরপরই হামিদুর রহমান আশ্রয়ণ প্রকল্প এলকার নির্মাণ কাজের দায়িত্বও বুঝে নেন। কাজের মান নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় আগের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিপলুর ঠিকাদার আবুল কালাম আজাদ মুন্সীর সাথে। আজাদ মুন্সী নিন্মমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে ঘর তৈরির অভিযোগ তুলেন এবং দ্বন্দ্ব চরমে উঠে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান সালাউদ্দিন ও মামুন নামে দুইজন ঠিকাদারের মাধ্যমে ৮৫ জন শ্রমিক খাটিয়ে আলাদাভাবে নির্মাণ কাজ চালাচ্ছেন।

 

ওদিকে, আজাদ মুন্সীর ৮০ জন শ্রমিকের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ আছে। এসব শ্রমিকরা এখন তাদের দুইজনের দ্বন্দ্বে মজুরি না পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় মানবেতর দিনযাপন করছেন।

 

আজাদ মুন্সীর নির্মাণ শ্রমিক নেতা মামুনুর রশিদ রয়েল বলেন, ঠিকাদার আজাদ মুন্সী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমানের দ্বন্দ্বে তারা সাইডে কাজ করতে পারছেন না। তাদের পাওনা মজুরিও দেয়া হচ্ছেনা। বরং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমানের নির্দেশে পুলিশ দিয়ে তাদের প্রকল্প এলাকা ত্যাগ করার জন্য হুমকি প্রদান করছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান দায়িত্ব নেয়ার পরও তারা দেড়মাস নির্মাণ কাজ করেছে। ২০ দিন ধরে তাদের কাজ বন্ধ করে দেয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

 

 

 

মোস্তফা নামে আরেক নির্মাণ শ্রমিক নেতা বলেন, উপজেলা তহসিলদার শরিফ শ্রমিকদের প্রকল্প এলাকা ত্যাগ করার জন্য হুমকি প্রদান করছে। তহসিলদার শরিফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হয়ে প্রকল্পের কেনাকাটা করে আসছে।

 

এদিকে, তদন্তের আভাস পেয়েই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান শ্রমিকদের দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী ঘর নির্মাণ উচ্চতা না থাকায় তার পূর্ণ নির্মাণ করছে। যেসব ঘর ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, সেই ঘরে লাগানো লিংটেল, প্রাক্কলন অনুযায়ী রড লাগানোর চেষ্ঠা করছে বলে অভিযাগ করছে। এছাড়া ইটের গাঁথুনিও সংশোধন করা চেষ্ঠা করছে।

 

নিন্মমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমানকে স্বপদে রেখে তদন্ত সঠিক না হওয়ার সংশয় প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

 

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, যেসব ঘর ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, সেই ঘরে লাগানো লিংটেল, টিন, ইটের গাঁথুনি ও দরজা-জানালার স্টিল পরীক্ষা করলে কোনো কিছুই প্রাক্কলন অনুযায়ী পাওয়া যাবে না।

 

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনায় ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করার কোন নিয়ম নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাদ্দকৃত অর্থের আয়ন ও ব্যয়ন করবে। ঠিকাদার নিয়োগের কোন সুযোগ নেই। আজাদ মুন্সীর কাজের ক্রটি ছিলো। সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে টাকাও নিয়েছে। যার কোন নিয়ম নেই। কাজের ক্রটি ধরা ও অনিয়ম পাওয়ার পর আজাদ মুন্সী নিজেই চলে গেছে।

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুই লেবার সর্দারের মাধ্যমে ৮৫ জন শ্রমিক দিয়ে তিনি প্রকল্পের কাজ করাচ্ছেন বলে তিনি জানান।

 

লেবারদের পাওনা মজুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের কিছু টাকা দেয়া হয়েছিলো। তারা আজাদ মুন্সীর অধীনে কাজ করেছে। লেবারদের আজাদ মুন্সীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ বা থানায় মামলা করতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু তারা কোনটাই করেনি।

 

এই বিষয়ে আজাদ মুন্সী বলেন, আমি নই, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান প্রকল্পে অনিয়ম করছে। ক্রটিপূর্ণ ঘর নির্মাণ করছে। আমি মাত্র ২০টির মতো ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলাম। একটির কাজও সম্পূর্ণ হয়নি। সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিপলু স্যার ১০ টাকা দিয়ে থাকলে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০ টাকা তাকে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

 

কাজের ক্রটি প্রসঙ্গে আজাদ মুন্সী বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বার বার বলা হয়েছিলো হিসেব নিয়ে বসতে। তিনি বসেননি। পরে বাধ্য হয়ে লিখিতভাবে তাকে হিসেব বিররনী দিয়ে এবং তা রিসিভ কপি নিয়ে চলে এসেছি। আমি থাকলে তার সিন্ডিকেটের লুটপাটের অসুবিধা হয়। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পরপরই তিনি ক্রটিপূর্ণ ঘরগুলোর কাজ সংশোধন করছেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.