২৪ ঘন্টাই খবর

বৃষ্টি নিয়ে শঙ্কা, বৃষ্টি নিয়ে ভাবনা”

বৃষ্টি নিয়ে শঙ্কা, বৃষ্টি নিয়ে ভাবনা

 

লেখক,এম.রনি ইসলাম (শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা)

 

‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে-ধান দিবো মেপে’ ছোটবেলায় গ্রামীণ শিশু-কিশোরদের কাছে বহুল পরিচিত একটি ছড়া গান।বৃষ্টিকে আহবান করার জন্য এটি আমরা গেয়েছি ছেলেবেলায়।সত্যিই যদি এমন গান গেয়ে বৃষ্টি আনা যেত, কি মজাই না হতো!

গান গেয়ে না হোক,অন্য কোনভাবেও যদি আকাশের মেঘকে ইচ্ছামতো ঝরাতে পারতাম আমরা,বৃষ্টিরুপে! অনেক সমস্যাই মিটে যেত।চৈত্রের বৃষ্টিহীন শুষ্ক আবহাওয়াকে বদলানো যেত।অনাবৃষ্টিতে শুকিয়ে যাওয়া অনেক শস্যক্ষেত ভরে উঠতো সবুজ ফসলে।ইচ্ছেমতো বৃষ্টি ঝরাবার এই আকাঙ্খা প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের মনে নানাভাবে কাজ করেছে।কখনো তা প্রতিফলিত হয়েছে মিথ্যা সংস্কারে কখনো আবার দেয়া হয়েছে দেবতার নামে পূজা।ব্যাঙ মেরেছে, পশু হত্যা করেছে,এমনকি মানুষকে পর্যন্ত বলি দিয়েছে।বৃষ্টির জন্য রচিত হয়েছে কবিতা,গান ও নানারকম ছড়া।দল বেঁধে নৃত্য করেছে মেয়েরা। বিশেষ ধরনের নলে আকাশের দিকে পানি নিক্ষেপ করেছে, এমনি আরো অনেক কিছু।

আরো পরে, মানুষ যখন বৃষ্টিপাত সমপর্কে বৈজ্ঞানিক কারণ অনেকটা জানতে পারলো, তখন নতুন পরীক্ষা শুরু হলো।ঘাসের ডগায় ও ধূলিকণায় শিশিরবিন্দু জমে-এই অভিজ্ঞতা থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন জলীয়বাষ্পকে ঘনীভূত করে জলবিন্দুতে রুপান্তরিত করতে ক্ষুদ্র অবলম্বন খুবই সহায়ক। ছোট্ট ধূলিকণা, ঘাসের ডগা,ধোঁয়ার কণিকা এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীনের কাজ করে।এসব ক্ষুদ্র বসার জায়গাকে আশ্রয় করে জলীয়বাষ্প সহজে জমতে পারে।এই তথ্যকে ভিত্তি করে মানুষ গুলি নিক্ষেপ করেছে মেঘের দিকে, নানা রাসায়নিক দ্রব্য পুড়িয়ে ধোঁয়া উড়িয়েছে আকাশে। কিন্তু এ সবই ব্যর্থ হয়েছে শেষ পর্যন্ত। কখনো কখনো ডিনামাইট ফাটিয়ে বৃষ্টি ঝরাবার দাবি কেউ কেউ করে থাকলেও, নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি যে,ধোঁয়া সৃষ্টি করে বা ডিনামাইট ফাটিয়ে বৃষ্টি ঝরানো যাবে।

আসলে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি ঝরাবার কৌশল আবিস্কৃত হয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এবং সেটা কিছুটা আকস্মিকভাবে। বৃষ্টির পানি কোথা থেকে আসে আমরা তা সবাই জানি।সাগর,হ্রদ,নদী,নালা-এমনকি গাছপালার পাতা থেকে পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায় এবং ওপরে গিয়ে তা ঠান্ডা হতে থাকে।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকাকে আশ্রয় করে এই ঠান্ডা জলীয়বাষ্প যখন অসংখ্য অত্যন্ত ছোট ছোট জলবিন্দুর সৃষ্টি করে এবং একইসঙ্গে উড়ে বেড়ায় তখন তাকে মেঘের মতো আমরা দেখতে পাই।যেসব কণিকাকে আশ্রয় করে এই অতি ক্ষুদ্র জলবিন্দুর সৃষ্টি হয় তা ধূলিকণা হতে পারে, সমুদ্র থেকে ওপরে উড়ে আসা লবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা হতে পারে,ধোঁয়া হতে পারে অথবা বিদ্যুৎ চকমকানোর ফলে বাতাসের অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন থেকে উৎপাদিত যৌগিক অণু হতে পারে, কখনো বা অতি ক্ষুদ্র বরফের কুচি হতে পারে। এগুলো কিন্তু একটি স্বাভাবিক বৃষ্টির ফোঁটার তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র -কয়েক লক্ষ ভাগের একভাগ।আর এজন্যই পৃথিবীর টানে এরা নিচের দিকে ধাবিত না হয়ে, বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

বৃষ্টি সমপর্কে এই জ্ঞানটুকু পাওয়ার পরই প্রথম চেষ্টা চললো কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটাবার।আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা নানা রকম জিনিস প্লেনের সাহায্যে নিক্ষেপ করতে থাকলেন আকাশে। কখনো ধূলিকণা, কখনো লবনের জল,কখনো এসিড। এতে ভোগান্তি হলো অনেক কিন্তু বিশেষ কোন ফল হলোনা।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি এরোপ্লেনের পাখায় বরফ জমার কারণ অনুসন্ধানের জন্যে ড.আয়ার ভিং ল্যাঙ্গমুরকে নিয়োগ করলেন।আর তাঁর সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত হলেন জোসেফ সেফার।(সূত্র উইকিপিডিয়া)

বরফ কেমন করে জমে তা পরীক্ষা করার জন্যে দুজন উঠে যেতেন উঁচু পাহাড়ে,সেখানে প্রচন্ড শীত আর ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে তারা পর্যবেক্ষণ চালাতেন। একটি জিনিস তাঁদের বিস্মিত করলো আর তা হলো পাহাড়ের ওপর অনেক সময় তাপমাত্রা অত্যন্ত কমে যাওয়া সত্বেও বরফ জমতো না পাহাড়ে।যে তাপমাত্রায় বরফ গলে পানি হয়ে যায় তার চেয়ে কম তাপমাত্রায় গেলে জলকণা বরফের কুচি সৃষ্টি করবে,এটাই আশা করা হয় স্বাভাবিকভাবে।এই সময়ে অবশ্য অনেক বিজ্ঞানী ব্যাখ্যা দিলেন যে,বরফের খুব ক্ষুদ্র কুচিকে আশ্রয় করেই আকাশে জলীয়বাষ্প জমে,বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি করে। এবং যেখানে এই অবলম্বন নেই,সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা হয়েও মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়না।সেফার ভীষণ উৎসাহিত হলেন সমস্যাটি সমাধানের জন্যে।তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফের দানা, যেমনটি তুলার মতো ফ্রিজের মধ্যে দেখা যায়, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে লাগলেন।

যুদ্ধের কাজ তখন তাঁর শেষ হয়ে গেছে। একটি ঠান্ডা করার যন্ত্র তিনি বাড়িতে বানালেন, যার মধ্যে জলীয়বাষ্পকে ঠান্ডা করে বরফে রুপান্তরিত করা যায়।তিনি যন্ত্রটাকে চালু করে একাধারে জলীয়বাষ্পকে ঠান্ডা করতে থাকলেন এবং ওপর থেকে নানারকম জিনিসের গুঁড়া ছিটাতে লাগলেন।মাসের পর মাস সব রকম বস্তু কণা দিয়েই পরীক্ষা চালালেন,কোনোই ফল হলো না। প্রায় ধৈর্য্য হারাবার মতো অবস্থা যখন, এমন এক সময় হঠাৎ একটি ঘটনা ঘটে গেল।

সেফার দুপুরে খেতে গিয়েছিলেন বন্ধুর সাথে, এসে দেখেন তার ঠান্ডা করার যন্ত্র অর্থাৎ ফ্রিজারের মুখ খোলা থাকায়, তার ভেতরটা অনেক গরম হয়ে গেছে।অর্থাৎ যে তাপমাত্রায় বরফ হবার কথা তার চেয়ে বেশিতে উঠে গেছে। আসলে তখন গরম পড়ে আসছিল,ফলে বাইরের আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল।সেফার ভাবলেন, তাঁকে আরো সাবধানে পরীক্ষা চালাতে হবে।কিন্তু আপাতত তাড়াতাড়ি তার ফ্রিজারকে ঠান্ডা করার জন্যে তিনি কার্বন-ডাই অক্সাইডের বরফ অর্থাৎ জমাট বাঁধা কার্বনডাই-অক্সাইডের গুঁড়া ধীরে ধীরে তার ফ্রিজারের মধ্যে ফেলতে লাগলেন। আকস্মিক ঘটনাটি এখানেই ঘটলো।সেফার বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসা বাতাসে যে জলীয়বাষ্প তা বরফের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুচিতে রুপান্তর হচ্ছে। এটা তিনি বুঝতে পারলেন, কারণ আলোর রশ্মি এসে এই অতি ক্ষুদ্র বরফ কুচিতে পড়ছিল। ঠিক যেমনটি হয়,যখন বিকেলের রোদ বেড়ার ছিদ্র দিয়ে ঘরে এসে ঢোকে এবং বাতাসে ভাসমান ধূলিকণাকে উজ্জ্বলভাবে আমরা দেখতে পাই।কার্বন- ডাইঅক্সাইডের বরফ আসলে সাধারণ বরফের চেয়ে অনেক ঠান্ডা। ইংরেজিতে যাকে ড্রাই আইস বলে।

সেফারের এখন কাজ হলো মেঘের ওপরে এমন ড্রাই আইস কেমন করে কাজ করে তা পরীক্ষা করা।নভেম্বরের এক শীতের দিনে আকাশে মেঘ দেখে সেফার প্লেনে করে উড়ে গেলেন আকাশে। সঙ্গে নিলেন ড্রাই আইস এবং তা মেঘের মধ্যে ছিটিয়ে দেয়ার যন্ত্র। সেফার প্লেন চালককে বল্লেন প্লেনটাকে মেঘের ওপরে নিয়ে যেতে,তারপর ড্রাই আইস ছড়াতে লাগলেন মেঘের ওপরে। মাত্র কয়েক কেজি ড্রাই আইসের গুঁড়া ছড়িয়েছেন এরমধ্যে ভীষণ ঠান্ডায় তাকে সরে যেতে হলো প্লেন নিয়ে। বাকি বরফগুলো অবশ্য তাড়াতাড়ি ফেলে দিলেন মেঘের মধ্যে। নিচে ছিলেন ল্যাঙ্গমুর। ভীষণ উত্তেজনার সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করলেন বৃষ্টি হয়ে ঝড়ছে সব মেঘ।খবরটা ছড়িয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। এরপর অনেকেই প্লেন থেকে ড্রাই আইস ছড়িয়ে বৃষ্টি ঝরাবার পরীক্ষাটি করতে লাগলেন।একবার ল্যাঙ্গমুর সমুদ্রপারের একটি বিরাট মেঘের ওপর এই পরীক্ষাটি করতে গেলেন। উদ্দেশ্য মুষলধারে বৃষ্টি সাগরের ওপরেই ঘটানো।কিন্তু মেঘটা ইতোমধ্যে সরে গেল ভূ-পৃষ্ঠের দিকে আর প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভেসে গেল নিকটবর্তী স্থলভাগ।

কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরাবার এই সাফল্যে সেফার ভাবলেন,বাতাসকে ড্রাই আইসের সাহায্যে ঠান্ডা করেই বৃষ্টি আনা সম্ভব। ফলে,বৃষ্টির জন্যে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিশেষ বস্তুকণা মেঘের মধ্যে ছড়াবার প্রয়োজন নেই।বার্নার্ড ফনগাট কিন্তু এখানেই থামতে রাজি হলেন না।জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানিতে চাকরিরত এই তরুণ বিজ্ঞানী খুঁজতে শুরু করলেন এমন বস্তুকণা, যার গঠন বরফের কণিকার মতো।

লবনের যেমন দানা আছে, বরফেরও তেমন দানা আছে। দানার এই বিশেষ গঠন প্রকৃতিকে কেলাস গড়ন বলে।কঠিন বস্তুর প্রত্যেক কেলাসের জন্য একটি বিশেষ গড়ন আছে। বার্নার্ড ফনগাট লক্ষ্য করলেন যে,সিলভার আয়োডাইড নামক বিশেষ যৌগিক পদার্থটির কেলাসের গড়ন বরফের কেলাসের গড়নের মতো।অর্থাৎ এর ছয়টা দিক আছে। সুতরাং এই সিলভার আয়োডাইডের অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো ঠান্ডা বাতাসে ছড়িয়ে তিনি বৃষ্টি পাবেন বলে আশা করলেন।

বেশ অনেকবার ব্যর্থ হয়েও হাল ছাড়লেন না তিনি।শেষ পর্যন্ত সাফল্য এলো।কারণ, প্রথম দিকে বিশুদ্ধ সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার না করার ফলেই অসুবিধা হচ্ছিল। সিলভার আয়োডাইড বেশ দামি পদার্থ হলেও খুব অল্প পরিমাণের এই পদার্থ দিয়েই প্রচুর জায়গা জুড়ে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব। তাই শেষ পর্যন্ত খরচ খুব বেশি পড়েনা।

মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্খা শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হয়েছে। গানের সুর ছড়িয়ে না হোক,সিলভার আয়োডাইডের গুঁড়া অথবা ড্রাই আইস ছড়িয়ে বৃষ্টি ঝরানো এখন আমাদের আয়ত্ত্বাধীন।

লেখক,এম.রনি ইসলাম (শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা)

‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে-ধান দিবো মেপে’ ছোটবেলায় গ্রামীণ শিশু-কিশোরদের কাছে বহুল পরিচিত একটি ছড়া গান।বৃষ্টিকে আহবান করার জন্য এটি আমরা গেয়েছি ছেলেবেলায়।সত্যিই যদি এমন গান গেয়ে বৃষ্টি আনা যেত, কি মজাই না হতো!
গান গেয়ে না হোক,অন্য কোনভাবেও যদি আকাশের মেঘকে ইচ্ছামতো ঝরাতে পারতাম আমরা,বৃষ্টিরুপে! অনেক সমস্যাই মিটে যেত।চৈত্রের বৃষ্টিহীন শুষ্ক আবহাওয়াকে বদলানো যেত।অনাবৃষ্টিতে শুকিয়ে যাওয়া অনেক শস্যক্ষেত ভরে উঠতো সবুজ ফসলে।ইচ্ছেমতো বৃষ্টি ঝরাবার এই আকাঙ্খা প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের মনে নানাভাবে কাজ করেছে।কখনো তা প্রতিফলিত হয়েছে মিথ্যা সংস্কারে কখনো আবার দেয়া হয়েছে দেবতার নামে পূজা।ব্যাঙ মেরেছে, পশু হত্যা করেছে,এমনকি মানুষকে পর্যন্ত বলি দিয়েছে।বৃষ্টির জন্য রচিত হয়েছে কবিতা,গান ও নানারকম ছড়া।দল বেঁধে নৃত্য করেছে মেয়েরা। বিশেষ ধরনের নলে আকাশের দিকে পানি নিক্ষেপ করেছে, এমনি আরো অনেক কিছু।
আরো পরে, মানুষ যখন বৃষ্টিপাত সমপর্কে বৈজ্ঞানিক কারণ অনেকটা জানতে পারলো, তখন নতুন পরীক্ষা শুরু হলো।ঘাসের ডগায় ও ধূলিকণায় শিশিরবিন্দু জমে-এই অভিজ্ঞতা থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন জলীয়বাষ্পকে ঘনীভূত করে জলবিন্দুতে রুপান্তরিত করতে ক্ষুদ্র অবলম্বন খুবই সহায়ক। ছোট্ট ধূলিকণা, ঘাসের ডগা,ধোঁয়ার কণিকা এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীনের কাজ করে।এসব ক্ষুদ্র বসার জায়গাকে আশ্রয় করে জলীয়বাষ্প সহজে জমতে পারে।এই তথ্যকে ভিত্তি করে মানুষ গুলি নিক্ষেপ করেছে মেঘের দিকে, নানা রাসায়নিক দ্রব্য পুড়িয়ে ধোঁয়া উড়িয়েছে আকাশে। কিন্তু এ সবই ব্যর্থ হয়েছে শেষ পর্যন্ত। কখনো কখনো ডিনামাইট ফাটিয়ে বৃষ্টি ঝরাবার দাবি কেউ কেউ করে থাকলেও, নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি যে,ধোঁয়া সৃষ্টি করে বা ডিনামাইট ফাটিয়ে বৃষ্টি ঝরানো যাবে।
আসলে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি ঝরাবার কৌশল আবিস্কৃত হয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এবং সেটা কিছুটা আকস্মিকভাবে। বৃষ্টির পানি কোথা থেকে আসে আমরা তা সবাই জানি।সাগর,হ্রদ,নদী,নালা-এমনকি গাছপালার পাতা থেকে পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায় এবং ওপরে গিয়ে তা ঠান্ডা হতে থাকে।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকাকে আশ্রয় করে এই ঠান্ডা জলীয়বাষ্প যখন অসংখ্য অত্যন্ত ছোট ছোট জলবিন্দুর সৃষ্টি করে এবং একইসঙ্গে উড়ে বেড়ায় তখন তাকে মেঘের মতো আমরা দেখতে পাই।যেসব কণিকাকে আশ্রয় করে এই অতি ক্ষুদ্র জলবিন্দুর সৃষ্টি হয় তা ধূলিকণা হতে পারে, সমুদ্র থেকে ওপরে উড়ে আসা লবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা হতে পারে,ধোঁয়া হতে পারে অথবা বিদ্যুৎ চকমকানোর ফলে বাতাসের অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন থেকে উৎপাদিত যৌগিক অণু হতে পারে, কখনো বা অতি ক্ষুদ্র বরফের কুচি হতে পারে। এগুলো কিন্তু একটি স্বাভাবিক বৃষ্টির ফোঁটার তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র -কয়েক লক্ষ ভাগের একভাগ।আর এজন্যই পৃথিবীর টানে এরা নিচের দিকে ধাবিত না হয়ে, বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
বৃষ্টি সমপর্কে এই জ্ঞানটুকু পাওয়ার পরই প্রথম চেষ্টা চললো কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটাবার।আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা নানা রকম জিনিস প্লেনের সাহায্যে নিক্ষেপ করতে থাকলেন আকাশে। কখনো ধূলিকণা, কখনো লবনের জল,কখনো এসিড। এতে ভোগান্তি হলো অনেক কিন্তু বিশেষ কোন ফল হলোনা।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি এরোপ্লেনের পাখায় বরফ জমার কারণ অনুসন্ধানের জন্যে ড.আয়ার ভিং ল্যাঙ্গমুরকে নিয়োগ করলেন।আর তাঁর সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত হলেন জোসেফ সেফার।(সূত্র উইকিপিডিয়া)
বরফ কেমন করে জমে তা পরীক্ষা করার জন্যে দুজন উঠে যেতেন উঁচু পাহাড়ে,সেখানে প্রচন্ড শীত আর ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে তারা পর্যবেক্ষণ চালাতেন। একটি জিনিস তাঁদের বিস্মিত করলো আর তা হলো পাহাড়ের ওপর অনেক সময় তাপমাত্রা অত্যন্ত কমে যাওয়া সত্বেও বরফ জমতো না পাহাড়ে।যে তাপমাত্রায় বরফ গলে পানি হয়ে যায় তার চেয়ে কম তাপমাত্রায় গেলে জলকণা বরফের কুচি সৃষ্টি করবে,এটাই আশা করা হয় স্বাভাবিকভাবে।এই সময়ে অবশ্য অনেক বিজ্ঞানী ব্যাখ্যা দিলেন যে,বরফের খুব ক্ষুদ্র কুচিকে আশ্রয় করেই আকাশে জলীয়বাষ্প জমে,বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি করে। এবং যেখানে এই অবলম্বন নেই,সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা হয়েও মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়না।সেফার ভীষণ উৎসাহিত হলেন সমস্যাটি সমাধানের জন্যে।তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফের দানা, যেমনটি তুলার মতো ফ্রিজের মধ্যে দেখা যায়, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে লাগলেন।
যুদ্ধের কাজ তখন তাঁর শেষ হয়ে গেছে। একটি ঠান্ডা করার যন্ত্র তিনি বাড়িতে বানালেন, যার মধ্যে জলীয়বাষ্পকে ঠান্ডা করে বরফে রুপান্তরিত করা যায়।তিনি যন্ত্রটাকে চালু করে একাধারে জলীয়বাষ্পকে ঠান্ডা করতে থাকলেন এবং ওপর থেকে নানারকম জিনিসের গুঁড়া ছিটাতে লাগলেন।মাসের পর মাস সব রকম বস্তু কণা দিয়েই পরীক্ষা চালালেন,কোনোই ফল হলো না। প্রায় ধৈর্য্য হারাবার মতো অবস্থা যখন, এমন এক সময় হঠাৎ একটি ঘটনা ঘটে গেল।
সেফার দুপুরে খেতে গিয়েছিলেন বন্ধুর সাথে, এসে দেখেন তার ঠান্ডা করার যন্ত্র অর্থাৎ ফ্রিজারের মুখ খোলা থাকায়, তার ভেতরটা অনেক গরম হয়ে গেছে।অর্থাৎ যে তাপমাত্রায় বরফ হবার কথা তার চেয়ে বেশিতে উঠে গেছে। আসলে তখন গরম পড়ে আসছিল,ফলে বাইরের আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল।সেফার ভাবলেন, তাঁকে আরো সাবধানে পরীক্ষা চালাতে হবে।কিন্তু আপাতত তাড়াতাড়ি তার ফ্রিজারকে ঠান্ডা করার জন্যে তিনি কার্বন-ডাই অক্সাইডের বরফ অর্থাৎ জমাট বাঁধা কার্বনডাই-অক্সাইডের গুঁড়া ধীরে ধীরে তার ফ্রিজারের মধ্যে ফেলতে লাগলেন। আকস্মিক ঘটনাটি এখানেই ঘটলো।সেফার বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসা বাতাসে যে জলীয়বাষ্প তা বরফের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুচিতে রুপান্তর হচ্ছে। এটা তিনি বুঝতে পারলেন, কারণ আলোর রশ্মি এসে এই অতি ক্ষুদ্র বরফ কুচিতে পড়ছিল। ঠিক যেমনটি হয়,যখন বিকেলের রোদ বেড়ার ছিদ্র দিয়ে ঘরে এসে ঢোকে এবং বাতাসে ভাসমান ধূলিকণাকে উজ্জ্বলভাবে আমরা দেখতে পাই।কার্বন- ডাইঅক্সাইডের বরফ আসলে সাধারণ বরফের চেয়ে অনেক ঠান্ডা। ইংরেজিতে যাকে ড্রাই আইস বলে।
সেফারের এখন কাজ হলো মেঘের ওপরে এমন ড্রাই আইস কেমন করে কাজ করে তা পরীক্ষা করা।নভেম্বরের এক শীতের দিনে আকাশে মেঘ দেখে সেফার প্লেনে করে উড়ে গেলেন আকাশে। সঙ্গে নিলেন ড্রাই আইস এবং তা মেঘের মধ্যে ছিটিয়ে দেয়ার যন্ত্র। সেফার প্লেন চালককে বল্লেন প্লেনটাকে মেঘের ওপরে নিয়ে যেতে,তারপর ড্রাই আইস ছড়াতে লাগলেন মেঘের ওপরে। মাত্র কয়েক কেজি ড্রাই আইসের গুঁড়া ছড়িয়েছেন এরমধ্যে ভীষণ ঠান্ডায় তাকে সরে যেতে হলো প্লেন নিয়ে। বাকি বরফগুলো অবশ্য তাড়াতাড়ি ফেলে দিলেন মেঘের মধ্যে। নিচে ছিলেন ল্যাঙ্গমুর। ভীষণ উত্তেজনার সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করলেন বৃষ্টি হয়ে ঝড়ছে সব মেঘ।খবরটা ছড়িয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। এরপর অনেকেই প্লেন থেকে ড্রাই আইস ছড়িয়ে বৃষ্টি ঝরাবার পরীক্ষাটি করতে লাগলেন।একবার ল্যাঙ্গমুর সমুদ্রপারের একটি বিরাট মেঘের ওপর এই পরীক্ষাটি করতে গেলেন। উদ্দেশ্য মুষলধারে বৃষ্টি সাগরের ওপরেই ঘটানো।কিন্তু মেঘটা ইতোমধ্যে সরে গেল ভূ-পৃষ্ঠের দিকে আর প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভেসে গেল নিকটবর্তী স্থলভাগ।
কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরাবার এই সাফল্যে সেফার ভাবলেন,বাতাসকে ড্রাই আইসের সাহায্যে ঠান্ডা করেই বৃষ্টি আনা সম্ভব। ফলে,বৃষ্টির জন্যে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিশেষ বস্তুকণা মেঘের মধ্যে ছড়াবার প্রয়োজন নেই।বার্নার্ড ফনগাট কিন্তু এখানেই থামতে রাজি হলেন না।জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানিতে চাকরিরত এই তরুণ বিজ্ঞানী খুঁজতে শুরু করলেন এমন বস্তুকণা, যার গঠন বরফের কণিকার মতো।
লবনের যেমন দানা আছে, বরফেরও তেমন দানা আছে। দানার এই বিশেষ গঠন প্রকৃতিকে কেলাস গড়ন বলে।কঠিন বস্তুর প্রত্যেক কেলাসের জন্য একটি বিশেষ গড়ন আছে। বার্নার্ড ফনগাট লক্ষ্য করলেন যে,সিলভার আয়োডাইড নামক বিশেষ যৌগিক পদার্থটির কেলাসের গড়ন বরফের কেলাসের গড়নের মতো।অর্থাৎ এর ছয়টা দিক আছে। সুতরাং এই সিলভার আয়োডাইডের অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো ঠান্ডা বাতাসে ছড়িয়ে তিনি বৃষ্টি পাবেন বলে আশা করলেন।
বেশ অনেকবার ব্যর্থ হয়েও হাল ছাড়লেন না তিনি।শেষ পর্যন্ত সাফল্য এলো।কারণ, প্রথম দিকে বিশুদ্ধ সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার না করার ফলেই অসুবিধা হচ্ছিল। সিলভার আয়োডাইড বেশ দামি পদার্থ হলেও খুব অল্প পরিমাণের এই পদার্থ দিয়েই প্রচুর জায়গা জুড়ে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব। তাই শেষ পর্যন্ত খরচ খুব বেশি পড়েনা।
মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্খা শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হয়েছে। গানের সুর ছড়িয়ে না হোক,সিলভার আয়োডাইডের গুঁড়া অথবা ড্রাই আইস ছড়িয়ে বৃষ্টি ঝরানো এখন আমাদের আয়ত্ত্বাধীন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.