২৪ ঘন্টাই খবর

পাটবীজের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ

দেশে উৎপাদিত বীজের মাধ্যমে চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়। বাকি চাহিদার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভারতীয় বীজের মাধ্যমে পূরণ হয়ে থাকে। প্রতি হেক্টর জমিতে পাট আবাদে পাঁচ থেকে সাত কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুযায়ী পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম এবং উৎপাদনে দ্বিতীয়। দেশে প্রতি বছর ৭ থেকে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে ৮০ থেকে ৯০ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদিত হয়। কিন্তু উৎপাদন মৌসুমে প্রায় ৯০ শতাংশ পাটবীজ আমদানি করতে হয়। যার সিংহভাগই ভারতে থেকে আসে। পাটবীজের আমদানি নির্ভরতার কারণে প্রতি বছরই পাট উৎপাদন কার্যক্রম ঝুঁকিতে থাকে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭ লাখ ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে ৮২ লাখ ৮৩ হাজার টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার মধ্যে মাত্র ৬ লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। করোনার কারণে দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবাদ মৌসুমে ভারত থেকে পাট বীজ আমদানি করা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য সরকার ৫ বছর মেয়াদি একটি গ্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আর তা বাস্তবায়ন হলে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলের বীজ আর আমদানি করতে হবে না। বরং কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন থেকে কৃষকদের ভর্তুকিমূল্যে দেয়া হবে পাটবীজ। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পাঁচ দশক আগেও দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। রপ্তানি করে আয় হতো মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। ওই কারণে নাম ছিল সোনালি আঁশ। অথচ প্রয়োজনীয় বীজের অভাবে পরিবেশবান্ধব গুরুত্বপূর্ণ ওই ফসলটির উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে। কিন্তু সরকার গৃহীত পদক্ষেপে দেশ পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পর কৃষক যাতে লাভবান হয় জন্য পাটবীজ আমদানি বন্ধ করে দেয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন প্রত্যয়ন বীজ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জিত হবে।
সূত্র জানায়, দেশে পাটের আওতায় মোট আবাদের ৯০ ভাগ জমিতে তোষা পাট, ৬ ভাগ জমিতে কেনাফ এবং ৪ ভাগ জমিতে দেশি পাটের আবাদ হয়। ওই হিসাবে দেশে মোট সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন তোষা পাটবীজ প্রয়োজন। কিন্তু গত অর্থবছরে ভারত থেকে সাড়ে ৪ হাজার টনের বেশি পাট বীজ আমদানি হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে ওই বীজ সময়মতো দেশে আসতে পারেনি। আর সময় মতো বীজ না আসায় পাটের উৎপাদন শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ কমে গেছে। ফলে কাঁচা পাটের বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
সূত্র জানায়, পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ৬৭৬ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন হবে। ৫ বছর মেয়াদি ওই প্রকল্প থেকে প্রথম বছরে ৩০০ কেজি, দ্বিতীয় বছরে ৬০০ কেজি, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে ৯০০ কেজি করে প্রজনন মানের বীজ বিএডিসিকে সরবরাহ করা হবে। প্রজনন মানের বীজ থেকে বিএডিসি প্রথম বছরে ২০ মেট্রিক টন ভিত্তিমানের বীজ, দ্বিতীয় বছর ৪০ মেট্রিক টন ভিত্তিমানের বীজ ও ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন প্রত্যায়িত মানের বীজ, তৃতীয় বছর ৬০ মেট্রিক টন ভিত্তিমানের বীজ ও ৩ হাজার মেট্রিক টন প্রত্যায়িত মানের বীজ, চতুর্থ বছর ৬০ মেট্রিক টন ভিত্তি মানের বীজ ও ৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন প্রত্যায়িত মানের বীজ এবং পঞ্চম বছরে চতুর্থ বছরের সমপরিমাণ বীজ উৎপাদন করবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর প্রথম বছরে বিনামূল্যে বীজ বিতরণের লক্ষ্যে ৩ হাজারটি, দ্বিতীয় বছরে বীনামূল্যে ৫ হাজারটি, তৃতীয় বছরে বীনামূল্যে ৬ হাজারটি এবং চতুর্থ বছর ভর্তুকি মূল্যে ৬ হাজার ৫০০টি ও পঞ্চম বছরে ভর্তুকি মূল্যে সমপরিমাণ প্রদর্শনী প্লট করবে। ভর্তুকি মূল্যে প্রতি কেজি বীজের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ১০০ টাকা। বিএডিসি চারটি বিভাগের ১৩টি জেলার ৫৯টি উপজেলায়, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের ৬টি বিভাগের ২০টি জেলার ৫০টি উপজেলায় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ৬টি বিভাগের ৪৩টি জেলার ১৯৮টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সূত্র আরো জানায়, কৃষিমন্ত্রী প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় ও সময় কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি পাঁচ বছরের পরিবর্তে ৩ বছরের মধ্যে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্য নিতে বলেছেন। তাছাড়া প্রকল্পটির ব্যয় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার কথা বলেছেন।
এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, অন্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। পাটবীজের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল থাকা যাবে না। দেশে পাটবীজের উৎপাদন বাড়ানো হবে। ফলে পাটের উৎপাদনও বাড়বে। পাট চাষকে এদেশের চাষিদের কাছে লাভজনক ফসলে উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য পাটের অসাধারণ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা  আবার ফিরিয়ে আনা হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.