২৪ ঘন্টাই খবর

গাজীপুরের গাছায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের ছড়াছড়ি ; ৭০ হাজার থেকে লাখ টাকায় মিলে সংযোগ

মোঃ মাসুম বিল্লাহ :
গাজীপুর মহানগরের গাছা মেট্রো থানা এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে প্রতি মাসে বিলের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তিতাস গ্যাসের কথিত ঠিকাদার ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। এভাবে কথিত ঠিকাদারদের মধ্যে কেউ কেউ রাতারাতি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন এমন অভিযোগও স্থানীয়দের। চক্রটি মূল্যবান জাতীয় খনিজ সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস লুট করে প্রতি মাসে সরকারকে বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে।
২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হলেও তিতাস গ্যাস কোম্পানীর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে স্থানীয় প্রভাবশালী ও দালালদের মাধ্যমে মোটা অংকের নগদ নারায়ণের বিনিময়ে অবৈধ সংযোগ দিয়ে যাচ্ছেন এমনটি বলছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসী জানান, তিতাস গ্যাস কোম্পানীর কতিপয় ঠিকাদার ৭০ হাজার থেকে লাখ টাকার বিনিময়ে রাতের আঁধারে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিচ্ছেন। এর পর এলাকার দালালদের মাধ্যমে প্রতিমাসে এসব অবৈধ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রচলিত সরকারি রেটে নিয়মিত ‘বিল’ আদায় করা হয়। এতে একদিকে যেমন দেশের মুল্যবান খনিজ সম্পদের অপচয় হচ্ছে, তেমনি সরকার প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও, তা আবার গোপনে পুন:সংযোগ দেওয়া হয়। অবৈধ গ্রাহকরা নিয়মিত ‘বিল’ দিতে গড়িমসি করলে বা ‘বিল’ বকেয়া পড়লে তিতাস গ্যাস কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। আর নিয়মিত ‘বিল’ পরিশোধ করলে সংযোগ নিরবিচ্ছিন্ন থাকে।
তড়িগড়ি করে রাতের আঁধারে অদক্ষ লোক দিয়ে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকে আশপাশের বাড়ির লোকজনও। যে কোন সময় অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। দুর্বল ব্যবস্থাপনায় এসব অবৈধ সংযোগের কারণে অধিকাংশ রাইজারের গোড়া দিয়ে ফিস ফিস শব্দে গ্যাস নির্গত হতেও দেখা যায়। এতে এলাকায় গ্যাস লিকেজ হয়েও অগ্নিকান্ডের মত ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় কুনিয়া, বড় বাড়ী, চান্দরা, গাছা রোড, তারগাছ, দক্ষিণ খাইলকুর, বটতলা রোড, কলমেশ্বর, বাদে কলমেশ্বর, ছয়দানা মালেকের বাড়ী, হারিকেন, ভুষির মিল, পলাগাছ, শরীফপুর, ডেগেরচালা, ওঝারপাড়া, গুতিয়ারা, জাঝরসহ আশপাশের এলাকায় শত শত অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, ঠিকাদার সোলায়মান মুন্সী ও তার ছেলে ফয়েজ, শরীফ, শামীম, কাজল, জয়নাল আবেদীন ও নাজমুল হোসেনের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। এরা পুরো এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এ সংক্রান্তে এদের বিরুদ্ধে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের একাধিক মামলাও রয়েছে। এমনকি ইতিপূর্বে এদের কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বাড়ির কেয়ারটেকার জানান, তাদের বাড়িতে ৫৬ জন ভাড়াটিয়া রয়েছে। ওই বাড়িসহ পাশের আরো ৩টি বাড়িতেই অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এ জন্য প্রতিমাসে কথিত বিল বাবদ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা দালালদের দিতে হয়। তিনি আরো জানান, বকেয়া বিল না দেওয়ায় চলতি মাসের ১১ তারিখে তাদের বাড়ির অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঠিকাদার নাজমুল রাতেই পুনরায় গ্যাস সংযোগ দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর এক বাড়ির মালিক জানান, তার বাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে এজন্য তাকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। তার মতো আশপাশের অনেক বাড়ির মালিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে এই চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের তাজুদ্দিন মৃধা রোডের অপর একটি বাড়ির কেয়ারটেকার জানান, ঠিকাদার সোলায়মান মুন্সীর ছেলে ফয়েজ তাদের দুই ইউনিটের ছয় তলা বাড়িতে মোট ১২টি ডাবল চুলার সংযোগ বৈধ করে দেওয়ার কথা বলে আট লাখ টাকা নেয়। কিন্তু এখনো সংযোগ বৈধ করার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছেন। একইসাথে প্রতিমাসে বিল বাবদ মোটা অংকের টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছেন।
অপরদিকে এলাকার কয়েকজন মুরব্বী জানান, গাছা বঙ্গবন্ধু কলেজ সংলগ্ন এলাকায় মোস্তফা কামাল রিপন, মনির প্রধান ও শাহাদাতের নেতৃত্বে শতাধিক অবৈধ চুলা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কখনো অভিযানে এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে আবার পুন:সংযোগ দেওয়ার নামে তারা বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা উত্তোলন করে কথিত ঠিকাদার ও তিতাস গ্যাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাসহ ভাগাভাগি করে নেন।
এদিকে শুধু আবাসিক পর্যায়েই নয়, শিল্প কারখানায়ও অবৈধ সংযোগ দিয়ে প্রতিমাসে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি। বিশেষ করে এলাকার ডাইং ও ওয়াশিং কারখানাগুলোতে অবৈধ সংযোগের রমরমা বাণিজ্য চলছে। যেসব কারখানায় বৈধ সংযোগ রয়েছে সেসব কারখানায়ও বিকল্প হিসাবে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে।
এব্যাপরে গাজীপুর জোনাল তিতাস গ্যাস অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শাহজাদা ফরাজী বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছি। কোন ছাড় নয়। এলাকায় একটিও অবৈধ গ্যাস সংযোগ থাকবে না। আপনাদের সহযোগিতা চাই।

Leave A Reply

Your email address will not be published.