২৪ ঘন্টাই খবর

বরগুনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

মাসুম বিল্লাহ্ : 
বরগুনা সদর উপজেলার  প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে  বার্ষিক উন্নয়ন (স্লিপ) বরাদ্দের টাকায় শিক্ষা উপকরণ ও মালামাল ক্রয়ে অনিয়ম ও টাকা আত্মসাতের পায়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষা বিভাগ সূত্র জানায়. বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে প্রতি বছর   বিদ্যালয় প্রতি ৫০ থেকে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। দুই ধাপে বরগুনা সদর উপজেলার ২২৮ টি বিদ্যালয়ে ১ কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়।
শিক্ষকরা অভিযোগ করেন ,বিদ্যালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন (স্লিপ) বরাদ্দের টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও বরাদ্দের টাকা অথবা কোনো মালামাল না দিয়ে শিক্ষা উপকরণ ও মালমাল কেনার তিনটি  বিল ভাউচার ধরিয়ে দিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, এই অর্থ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়।  এরপর তারা সব শিক্ষক মিলে চাহিদা অনুযায়ী মালামাল ক্রয়সহ নানা কাজে ব্যয় করে এসব ব্যয়ের বিল-ভাউচার জমা দেন।কিন্তু এবার মালামাল না কিনেই তিনটি বিল-ভাউচার ধরিয়ে দিয়ে বরাদ্দের অর্থ তুলে শিক্ষা কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত বরাদ্দের টাকায় ভাগ বসাতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকেরা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন।
শিক্ষকেরা জানান, বিদ্যালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন (স্লিপ) বাস্তবায়নের জন্য ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি রয়েছে। এরমধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ তিনজন শিক্ষক এবং একজন বিদ্যালয় ম্যানিজিং কমিটির সদস্য ও একজন পিটিএ কমিটির সদস্য। এই কমিটি মালামাল ক্রয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বরগুনা সদর উপজেলার ২২৮ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন  তহবিলের আওতায় শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য  সামগ্রী কেনার জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের অনুকূলে প্রত্যেকটি বিদ্যালয়কে  ৩৬ হাজার টাকা করে মোট ৮২ লাখ ৮ হাজার টাকার  বিল-ভাউচার ধরিয়ে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়। পাবনা জেলার তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে এসব ভৌতিক বিল ভাউটার দেওয়া হয়েছে। অথচ বিলে উল্লেখিত  কোনো মালামাল বিদ্যালয়গুলোতে সরবরাহ করা হয়নি।
এসব বিদ্যলয়ের প্রত্যেকটিতে দেওয়া পাবনা জেলার তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিল  ভাউচারে দেখা যায়, জহির জাদিদ এন্টারপ্রাইজ থেকে ৭টি মুজিব কোর্ট ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ৯টি স্টুডেন্ট কাউন্সিলর পোশাক ৪ হাজার ৫০০ টাকা,১২টি হলদে পাখি পোশাকে ৬ হাজার টাকা,১০০টি মাস্ক ২০ টাকা দরে ২ হাজার টাকা,১১ টি স্প্রে  দেড় হাজার টাকা, বঙ্গবন্ধু কর্ণারের জন্য বই ৩ হাজার টাকা, একটি পাপশ ১ হাজার টাকা, ডিজিটাল থার্মোমিটার ৩ হাজার টাকা, একটি অক্সিমিটার দেড় হাজার টাকা, একটি ডিজিটাল ক্লাস টিচার ১০ হাজার টাকা খরচ করে মোট ৩৬ হাজার টাকার কেনাকাটা করেছেন কর্তৃপক্ষ।
সদর উপজেলা চরকগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক নরেন্দ্র সরকার বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে আমাকে দেওয়া তিনটি বিল ভাউচারে শুধু স্বাক্ষর করতে বলা হলে আমি স্বাক্ষর করি,আর কিছু জানি না আমি।
দক্ষিণ লেমুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো.মিরাজ বলেন, শিক্ষা উপকরণ বা মালামাল কেনার বিল ভাউচারে আমরা শুধু স্বাক্ষর দিয়েছি। এর বাইরে আমরা আর কোনা কাজে আসিনি।বিলের ৩৬ হাজার টাকা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার পর সেই টাকা তুলে আবার স্যারের কাছে দিতে হবে।
দক্ষিণ পাতাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর বলেন বিদ্যালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা হাতে আসার পর এই টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য মালামাল কেনা হয়। কিন্ত টিও স্যার আমাকে ৩৬ হাজার টাকা পরিমাণের পাবনা জেলার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তিনটি লিখিত বিল ভাউচার  স্বাক্ষর নেয়। এই ৩৬ হাজার টাকা আমার ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। তারপর তারা তাদের ইচ্ছে মত আমাদের মালামাল সরবারহ করবেন।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন,  উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে এ বছরের  বিদ্যালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন (স্লিপ) টাকার মালামাল তারা কিনে দেবেন। আমাদের শুধু বিল ভাউচার দিতে বলা হয়েছে। এটা মারাত্মক অনিয়ম। আগে কখনো এমন অনিয়ম হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তা সুব্রত কুমার দাস প্রথম আলোকে  বলেন, স্লিপের বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায়নি।শিক্ষকদের কাছ থেকে আগাম কাজের বিল ভাউচার চাওয়া হলে তারা বিল ভাউচার অফিসে জমা দিয়েছেন।তারা কোথা থেকে বিল ভাউচার এনেছেন তা আমার জানা নেই। আমরা কোনো বিল ভাউচার বা রশিদ সরবারহ করি নি।
পূর্ব ধূপতির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক বিকাশ চন্দ্র রায় বলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ২২৮ বিদ্যালয়ের স্লিপের কাযক্রম অনিয়ম করে সম্পন্ন করতে চাচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে বরগুনা সদর উপজেলা শিক্ষা প্রাথমিক কর্মকর্তা মো.নাছির উদ্দিন,বলেন আমি শিক্ষকদের কাছে কোনো ধরনের বিল ভাউচার সরবারহ করিনি। তাঁর দাবি, পাবনার ব্যবসায়ীরা এখানে (বরগুনা) এসে শিক্ষকদের কাছে মালামাল বিক্রি করে গেছেন। বরাদ্দের টাকা দিয়ে মালামাল কেনার দায়িত্ব শিক্ষকদের আমি কেনো শিক্ষা উপকরণ বা মালামলা কিনতে যাবো-পাল্টা প্রশ্নও রাখেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম মিজানুর রহমান বলেন বিদ্যালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন (স্লিপ) তহবিলের  টাকা দিয়ে মালামাল কেনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই।
এই বরাদ্দ ব্যয়ে কোনো প্রকার অনিয়ম হয়েছে কি না  তা দেখার জন্য সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকতাকে মৌখিক নির্দেশ   দিয়েছেন বরগুনা জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান। তিনি  বলেন, অভিযোগের  সত্যতা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়ম অনুযায়ী এই অর্থ দিয়ে সবকিছু ক্রয় করবেন  বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা বিদ্যালয় কমিটির  সভাপতি ও শিক্ষকগণসহ একটি ক্রয় কমিটি। কোনোভাবেই অন্য কেউ এটা ক্রয় করে দেওয়ার নিয়ম নেই।

Leave A Reply

Your email address will not be published.