২৪ ঘন্টাই খবর

করোনাকালে রমজান লিভার সিরোসিস রোগীদের সমস্যার সমাধান

-ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
আমাদের মাঝে এসেছে পবিত্র মাহে রমজান।সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজানুল মোবারক শুরু হয়েছে। মহান আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম এই রমজানে সক্ষম সবাই রোজা রাখার চেষ্টা করেন। এ বছর প্রচন্ড গরমে প্রায় ১৫ ঘণ্টা সময় উপবাস থাকতে  হচ্ছে। লিভারের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের পবিত্র রমজান মাসের করনীয়  সম্পর্কে জেনে নিই।প্রথমে জানবো কোন লিভার রোগের রুগীরা রোজা রাখতে পারবেন আর কারা পারবেন না। যদিও সবার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য হবেনা। তবুও আমরা একটি সাধারণ আলোচনা করতে পারি। এই রমজানে অনেক লিভার রোগী ডাক্তারদের কাছে জানতে চান তাদের রোজা রাখা ঠিক হবে কী হবে না?
এটা আসলে বড় আঙ্গিকে আলাপের বিষয়। কোন কোন লিভার রোগী রোজা রাখতে পারবেন আর কোন লিভার রোগীর জন্য রোজা রাখা বাঞ্ছনীয় না। শুধু লিভার রোগ না, অনেক রোগের ক্ষেত্রেই রোজা রাখা বাঞ্ছনীয় নয়।
যেসব রোগীদের লিভারে ফ্যাট বা চর্বি আছে তাদের জন্য রোজা রাখা ভাল। কারণ, যদি আমরা সত্যিকার অর্থে রোজা রাখি, রোজা রাখার মতো করে রাখি, খাবার গ্রহণে সংযমী হই, নানা ধরনের ফার্স্টফুড জাতীয় খাবার বা চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করি তাহলে সেটা লিভারে চর্বি কমাতে সাহায্য করে।তবে যারা লিভার সিরোসিস রোগী, যাদের লিভার সিরোসিস খারাপের দিকে আছে, অ্যাডভান্স সিরোসিস বা ফেইলিউর আছে এমন লিভার রোগীরা যদি রোজা রাখেন তাহলে ঝামেলা হয়ে যেতে পারে। আজকের বিষয় নিয়ে কলাম লিখেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট হোমিও গবেষক ডা. এম এম মাজেদ তাঁর কলামে লিখেন…. আমরা জানি, লিভারের অন্যতম একটা কাজ হচ্ছে, আমরা যে খাবারগুলো গ্রহণ করি সেগুলো প্রসেস করে শরীরে শক্তি হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখে। কিন্তু যাদের লিভার ঠিক মতো কাজ করছে না তাদের এই কাজগুলো ঠিক ভাবে হবে না। যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের রক্তে সুগারের মাত্রা নিচের দিকে নেমে যেতে পারে।ডায়াবেটিস না থাকলেও তা ঠিকভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই যাদের লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর বা জটিল কোন জন্ডিস থাকে তাদের জন্য রোজা রাখা বাঞ্ছনীয় নয়।এক কথায়, লিভার যখন সিরিয়াসলি আক্রান্ত থাকবে- লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর, হেপাটাইটিস, লিভার ক্যান্সার- অর্থাৎ লিভারের কার্যক্ষমতা যখন স্বাভাবিক থাকবে না তখন রোজা রাখা যাবে না। অন্যথায় যাবে।মানব শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার। লিভার বিভিন্নভাবে রোগাক্রান্ত হতে পারে। রোগের স্থায়ীত্বের উপর নির্ভর কের লিভার রোগকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘ মেয়াদী। বিভিন্ন রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশীি যে রোগের প্রাদুর্ভাব তাহলো, হেপাটাইটিস ভাইরাস দিয়ে ঘটিত লিভার প্রদাহ। হেপাটাইটিস ভাইরাগুলো হলো- এ, বি, সি, ই এবং ডি। ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাস লিভারের স্বল্প মেয়াদী প্রদাহ করে এবং ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস দীর্ঘ মেয়াদী প্রদাহ করে। ইরাস ঘটিত দীর্ঘ মেয়াদী প্রদাহ থেকে লিভার সিরোসিস হয়। এছাড়া যে যে কারণে লিভার সিরোসিস হয়, ত হলো- দীর্ঘ দিন অ্যালকোহল সেবন, লিভারে ফ্যাট জমা থাকা, কপার মেটাবলিজমে সমস্যা জনিত উইলসনস ডিজিজ এবং আরও বিভিন্ন কারণ। স্বল্প মেয়াদী সমস্যার মধ্যে আরও আছে লিভার অ্যাবসেস ও অন্যান্য রোগসমূহ।লিভারের স্বাল্প মেয়াদী সমস্যাগুলোতে বিভিন্ন ধরণের ল্কষণ দেখা যেতে পারে। স্বল্প মেয়াদী সমস্যায় জন্ডিস, ক্ষুধামন্দা, বমি-বমি ভাব, বমি হওয়া, জ্বর ও পেটে ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়। যাদের হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ জনিত একিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস হয় তাদের ক্ষেত্রে জন্ডিস, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, বমি-বমি ভাব, জ্বর ইত্যাদি লক্ষণ যদি অল্প মাত্রায় দেখা দেয় এবং ওষুধ সেবনে নিয়ন্ত্রণে থাকে তারা রোজ রাখতে পারবেন। তবে যদি কারও ক্ষেত্রে উক্ত লক্ষণগুলো বেশী মাত্রায় দেখা দেয়ার পাশাপাশি কাওয়ায় অরুচি চলে আসে তাদের ক্ষেত্রে লিভারের কাজ আশংকাজনভাবে বাধাগ্রস্থ হয় এবং কারও কারও একিউট লিভার ফেইলিউরও হয়। এ ধরণের রোগীরা রোজ রাখতে পারবেন না। তবে প্রশ্ন হল, যারা দীর্ঘ মেয়াদী লিভার প্রদাহে ভুগছেন তারা কি রোজা রাখতে পারবেন আর   শরীরের অন্যতম বৃহৎ অঙ্গ লিভার। মানুষ দৈনন্দিন যে খাদ্য গ্রহণ করে তা প্রথমে অন্ত্রনালিতে পরিপাক হয়। পরে ওই খাদ্য নিঃসৃত উপাদান প্রথমে লিভার হয়ে রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। লিভার রোগাক্রান্ত হলে ওই কাজে বিভিন্ন মাত্রায় ব্যাঘাত ঘটে। রোজার সময় যেহেতু দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকতে হয়, সেহেতু লিভারের ওপর রোজার প্রভাব ও রোগীদের রোজা পালনের নিয়ম সম্পর্কে জানা দরকার। * লিভারের ওপর প্রভাবঃ-
রোজার সময় সাহরিতে যে খাবার গ্রহণ করা হয় তা থেকে ও লিভারে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন থেকে সারা দিনের উপোসের সময় রক্তে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সঞ্চালিত হয়। লিভারের গ্লাইকোজেন স্টোরেজ শেষ হয়ে গেলে লিভার ও এডিপোজ টিস্যুতে জমাকৃত চর্বি বিপাকের মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজ সরবরাহ হয়। ফলে রমজান মাসের প্রথম ১০ দিন পর একজন রোজাদারের জন্য লিভারের ফ্যাট ও শরীরের বাড়তি ওজন কমার সুযোগ তৈরি হয়। তবে তা নির্ভর করে ইফতার ও সাহরির সময় ও এর মধ্যবর্তী সময়ে রোজাদারের খাদ্যাভ্যাসের ওপর।লিভার ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা বোঝাতে রক্তে বিলিরুবিন, এএলটি, এএসটি ও এএলপি নামক মার্কারগুলোর ঘনত্ব দেখা হয়। কেউ টানা ১৫ ঘণ্টা পানাহার থেকে বিরত থাকলে বিলিরুবিন হালকা মাত্রায় বেড়ে যায়, তবে তা স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে না।শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ করলে ওই মাত্রা আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। রমজান মাসের প্রথম ১০ দিন বিলিরুবিনের মাত্রা কিছুটা বাড়ে ও শেষ ১০ দিনে তা আবার কমতে শুরু করে। অর্থাৎ রোজা রাখলে একজন সুস্থ মানুষের রক্তে বিলিরুবিন স্বাভাবিক সীমায় ওঠানামা করতে থাকে। এএলটি, এএসটি ও এএলপির ওপর রোজার কোনো প্রভাব পাওয়া যায় না। অর্থাৎ রোজা রাখলে লিভার তার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখে এবং একজন সুস্থ মানুষের লিভারে রোজার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই। * স্বল্পমেয়াদি হেপাটাইটিসঃ-
সাধারণত হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ দিয়ে আক্রান্ত ভাইরাল হেপাটাইটিসে লিভারের স্বল্পমেয়াদি (একিউট) সমস্যা হয়। আক্রান্ত রোগীর জন্ডিস, ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, জ্বর ও পেটে ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়। এরপর এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রোগ ভালো হতে শুরু করে। তবে এই সময় শরীরে দুর্বলতা থেকে যায়। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে ওই লক্ষণগুলো বেশি মাত্রায় দেখা দেয়, পেটে পানি জমে ও জ্ঞান লোপ পায়। এ অবস্থাকে একিউট লিভার ফেইলিওর বলে। একিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস ও একিউট হেপাটিক ফেইলিওরের কোনো অবস্থাতেই রোগী রোজা রাখতে পারবেন না। তবে সুস্থ হয়ে উঠলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরে রোজা রাখা যাবে* দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিসঃ-
হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস ও ‘সি’ ভাইরাস দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) লিভার প্রদাহ হয়। ক্রনিক ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর সাধারণত কোনো ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায় না এবং তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। এই রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করে রোজা রাখতে পারেন। ক্রনিক হেপাইটাইটিসের রোগীদের যে অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ দেওয়া হয়, তা ২৪ ঘণ্টা কাজ করে। ফলে রোজা রাখার কারণে ওষুধ সেবনেও কোনো অসুবিধা হয় না।* লিভার সিরোসিসঃ-
লিভার সিরোসিস হলে ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি, দুর্বলতা, পেটে গণ্ডগোল, পেটে পানি আসা ও জন্ডিস বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়।কমপেনসেটেড সিরোসিসের রোগীরা সিরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে এবং লিভার তার কার্যক্রম প্রয়োজনীয় মাত্রায় চালিয়ে যেতে সক্ষম থাকে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে ক্ষুধামান্দ্য ও অরুচি প্রকট হয় না। এসব রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করে রোজা রাখতে পারবে। ডিকমপেনসেটেড সিরোসিসের রোগীদের অতিমাত্রায় ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি, বমির সঙ্গে রক্ত আসা, জন্ডিস, পেটে পানি আসা ও চেতনা লোপ পাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। যারা ডিকমপেনসেটেড লিভার সিরোসিসে ভুগছে তারা রোজা রাখতে পারবে না। কারণ এতে সিরোসিসজনিত সমস্যা বাড়তে পারে।
*ফ্যাটি লিভারঃ-যাঁদের লিভারে ফ্যাট জমা হয়েছে তাঁদের জন্য রোজা রাখা উত্তম। রোজা রাখার পাশাপাশি ইফতার ও সাহরিতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে লিভারের ফ্যাট কমানো যায়।*লিভার অ্যাবসেসঃ-লিভার অ্যাবসেসের রোগীদের কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ও পেটের ডানদিকে বুকের নিচে ব্যথা হয়। অ্যাবসেস থেকে জীবাণু ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়লে কাশি, শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা হতে পারে। এ ধরনের রোগী রোজা রাখতে পারবেন না। তবে লক্ষণের মাত্রা কম থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে রাখা যাবে। হাইডাটিড ডিজিজ ও অন্যান্য ইনফেকশন হাইডাটিড ডিজিজে লিভার বড় হয়ে যায় এবং পেটে হালকা ব্যথা হতে পারে। রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখতে পারবেন। লেপটোস্পাইরা ও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত লিভার রোগী রোজা রাখতে পারবেন না। অন্যান্য লিভার ইনফেকশনের ক্ষেত্রেও রোগের লক্ষণ ভেদে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখতে হবে।* ওষুধ গ্রহণের নিয়মঃ-
যেসব ওষুধ সকালে খেতে হয় রমজান মাসে তা ইফতারের পরপর ও যেসব ওষুধ রাতে গ্রহণ করা হতো তা সাহরির সময় গ্রহণ করা যায়।যেই সব ওষুধ বিকালে খেতে সেই সব ওষুধ  তারাবীর পরে খাবেন।দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগে যে ওষুধ খেতে হয় সেটি ইফতারের সময় গ্রহণ করাই ভালো। * মাহে রমজানে সিরোসিস রোগীদে’র পরামর্শঃ-  রাস্তার পাশের শরবত ও পানীয় পানে ডায়রিয়া ও ভাইরাল হেপাটাইটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তাই বাসায় তৈরি খাবারকে প্রাধান্য দিন।* বেশি তেলে ও একই তেলে বারবার ভাজা ও তৈলযুক্ত ভারী খাবার পরিহার করুন।*  ইফতারের সময় খেজুরসহ বিভিন্ন মিষ্টি ফল ও মিষ্টি শরবত রাখুন। রুচির বিভিন্নতা আনতে পরিমিত দই-চিঁড়া, স্যুপ, হালিম খেতে পারেন।* পোলাও, তেহারি, কাচ্চি জাতীয় ভারী খাবার প্রতিদিন গ্রহণ করা ঠিক নয়।* শেষ রাতের খাবার এমন হতে হবে, যা সুপাচ্য ও দিনের শুরুতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দিতে পারে। এ জন্য সাহরির খাবারে রুটি বা ভাত থাকা জরুরি। কারণ এগুলো ধীরে ধীরে হজম হয়।* খাবারে পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত এবং অতিরিক্ত লবণ যথাসম্ভব পরিহার করা জরুরি।
★ হোমিও সমাধানঃ-রোগ নয় রোগিকে চিকিৎসা করা হয়, এই জন্য  লিভার সিরোসিসের প্রাথমিক ও মারত্মক লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় লিভার সিরোসিসের  রোগিকে  সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করলে আল্লাহর রহমতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাতে সম্ভব।
লেখক,
সম্পাদক ও প্রকাশক,দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য
 স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, হিউম্যান রাইটস রিভিউ সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমিটি
কো-চেয়ারম্যান,হোমিওবিজ্ঞান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

Leave A Reply

Your email address will not be published.