২৪ ঘন্টাই খবর

করোনা কেড়ে নিলো কুলিয়ারচরের মৃৎশিল্পীদের মুখের হাসি


করোনা কেড়ে নিলো কুলিয়ারচরের মৃৎশিল্পীদের মুখের হাস

 

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিঃ

 

বৈশাখকে সামনে রেখে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ নববর্ষকে ঘিরে নির্ঘুম ব্যস্ত সময় পার করতেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার অধিকাংশ মৃৎশিল্পীরা। মরণঘাতী কোভিড-১৯ করোনা প্রভাবে গত বছরের ন্যায় এ বছরও কেড়ে নিলো মৃৎশিল্পীদের মুখের হাসি।

 

প্রতি বছর এই মাসে দর্শনার্থী স্থানে বসে বর্ষবরণ মেলা। সেই মেলায় চাহিদা থাকে নানান রকমের খেলনা এবং মাটির তৈজসপত্রের। আর মেলাকে দৃষ্টিনন্দিত করতে মৃৎশিল্পীরা নিজের হাতে নিপুণ কারুকার্যে মাটি দিয়ে তৈরি করেন শিশুদের জন্য রকমারি পুতুল, ফুলদানি, রকমারি ফল, হাড়ি-পাতিল, কড়াই, ব্যাংক, বাসন, থালা, বাটি, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, টিয়া, ময়না, ময়ূর, মোরগ, খরগোশ, হাঁস, কলস, ঘটি, মুড়িভাজার ঝাঞ্জুর, চুলা ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন মাটির তৈজসপত্র।

 

মরণঘাতী কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে গত বছরের ন্যায় এ বছরও সরকারী নিষেধাজ্ঞার ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে এ ব্যবসায়। উপজেলার দোয়ারিয়া কুমার পাড়া এলাকায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ২০টি পরিবার। তারা বিভিন্ন উৎসবে মাটির তৈরির জিনিসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

 

বাংলা নববর্ষ বরণে জেলার বিভিন্ন স্থানের মেলায় অধিকাংশ মাটির সামগ্রী সরবরাহ করে থাকেন এসব মৃৎশিল্পীরা। তাই এখানে পুরুষ মৃৎশিল্পীদের পাশাপাশি নারী মৃৎশিল্পীরাও সমতালে কাজ করেন। তাদের অধিকাংশ নারী-পুরষই শ্রমের বিনিময়ে তাদের উন্নয়নের ভিত শক্ত করেন।

 

বৈশাখী মেলা উপলক্ষে নারী মৃৎশিল্পীরা নিজের হাতে নিপুণ কারুকার্যে মাটি দিয়ে তৈরি করতেন শিশুদের নানান খেলনা। বর্তমান সময়ে করোনার প্রভাবে ওইসব খেলনা তৈরির কাজ যেনো থমকে গেছে। করোনা ভাইরাস তাদের একেবারে পথে নামিয়ে দিয়েছে। এ ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই চলতো তাদের সংসার।

 

রোববার (১১এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিন ঘুরে উপজেলার দোয়ারিয়া গ্রামের কুমার পাড়া গিয়ে মৃৎশিল্পী জোসনা রানী পাল (৭০), শিখা রানী পাল (৩০), শিউলী রানী পাল (৩৫), পরিমল পাল (৭৫), সরস্বতী পাল (৬০), সুধাংশু চন্দ্র পাল (৬৫), সচিন্দ্র চন্দ্র পাল (৭০), শ্যামল চন্দ্রপাল (৪৪), পরিমল চন্দ্র পাল (৮০) ও রতন পাল (৩৪) দের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, তাদের খেলনা তৈরি বন্ধ করে অপলক দৃষ্টিতে চোখে-মুখে হতাশার ছাপ নিয়ে বসে আছেন। আবার কেউ কেউ অন্যান্য কাজ করছেন।

 

ওইদিন দীর্ঘক্ষণ মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, পারিবারিক ভাবেই আমরা পৈতৃক পেশা এই মাটির কাজ ধরে রেখেছি। পণ্যের রং ও নকশার কাজ আমরা নিজেরাই করে থাকি।

 

মৃৎশিল্পী জোসনা রানী পাল বলেন, আমাদের কাজে ছেলে-মেয়েরা সবাই সহযোগিতা করে। এ পেশাতেই সংসারে সবার মুখে ঠিকমত দু-বেলা দু-মুঠো খাবার জুটিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চলাতাম। এখন লকডাউন শুরু হওয়ার কারণে মেলাও বসবে না। তাই পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়ে গেলাম। হয়তো এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।

 

পরিমল চন্দ্র পাল বলেন, মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা শুরু করেন প্রায় ১৫ বছর আগে। সংসারের সচ্ছলতা ঠিকই এসেছিলো কিন্ত করোনায় সব শেষ করে দিয়েছে বলে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

 

আরেক মৃৎশিল্পী শিউলী রানী পাল বলেন, বৈশাখী মেলা আর মাত্র ৩ দিন বাকী। বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে এক একটি পরিবার প্রায় ১০ হাজার খেলনাসহ মাটির জিনিসপত্র তৈরি করা শুরু করে ছিলো। কয়েক দিনের মধ্যেই রঙের কাজও শেষ করা হতো। মেলায় বিক্রির জন্য পাইকাররাও যোগাযোগ শুরু করেছিলো। নারীরাও তাদের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তনের জন্য এ মৃৎশিল্পের কাজই করে আসছিলো। কিন্তু লকডাউনের ফলে সব থেমে গেছে।

 

আরেক মৃৎশিল্পী রতন চন্দ্র পাল হতাশাগ্রস্ত হয়ে বলেন, কিছুই বুঝে ওঠতে পারছি না। বাপ-দাদার পেশা ছাড়তেও পারি না। বৈশাখের বিক্রি দিয়েই আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে প্রায় ৬ মাস চলতে পারি। কিন্তু গত বছর ও চলতি বছরে আমাদের স্বপ্ন শেষ করে দিলো করোনা ভাইরাসে। আমাদের এখন জীবিকা নির্বাহ করার পথটি বন্ধ হয়ে পড়ছে। এ পাড়ার অনেকেই বিভিন্ন এনজিও থেকে কড়া সুদে টাকা এনে এখন পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।তিনি আরো বলেন, করোনা কালীন এই সময় পরিবার নিয়ে আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি।

 

বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের কদর বাড়ে বৈশাখ আসলেই। শুধু মেলা এলেই কেবল কর্মমুখর হয়ে ওঠে চিরচেনা ঐতিহ্যময় প্রাচীন এই মৃৎশিল্পীসমৃদ্ধ এ গ্রামটি। পহেলা বৈশাখের আগে খানিকটা সময়ের জন্য হলেও মৃৎশিল্প তার হৃতগৌরব ফিরে পায় এবং মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নানান সামগ্রী তৈরিতে। কিন্ত করোনার প্রভাবে তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে।

 

সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কুমার পাড়ার মৃৎশিল্পিদের দাবি, তাদের জীবন বাঁচাতে সরকার থেকে যেনো প্রণোদনার ব্যবস্থা করে দেয়া হয় এবং যারা বিভিন্ন এনজিও থেকে কড়া সুদে টাকা এনেছে তাদের উপর লকডাউন চলাকালে কিস্তি দেওয়ার চাপ বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.