২৪ ঘন্টাই খবর

জাল মুদ্রা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে আইনে যুক্ত হচ্ছে নতুন ধারা

দেশে জাল নোট সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের জন্য আলাদা কোন আইন নেই। দ-বিধি ১৮৬০-এর ৪৮৯ (ক) থেকে (ঘ) ধারা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর ২৫ (ক) ধারা অনুযায়ী জাল মুদ্রা সংক্রান্ত অপরাধের বিচার চলে। কিন্তু ওসব আইনে বিচার করতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে জাল মুদ্রা সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যুক্ত হচ্ছে দু’ডজন নতুন ধারা।  প্রস্তাবিত খসড়া আইনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা জাল নোট তৈরি করা হয় এমন কোন সন্দেহজনক স্থানে প্রবেশ, পরিদর্শন কিংবা বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি চালাতে পারবে। এমনকি তল্লাশির সময় সন্দেহভাজন কাউকে আটকও করা যাবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রচলিত আইনে জাল নোট যার হাতে থাকবে তিনিই আইনের আওতায় আসবে। ফলে অনেক গ্রাহক না জেনেই জাল নোট বহন করে হয়রানির শিকার হচ্ছে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে, কোন ব্যক্তি যদি সরল বিশ্বাসে নিজের অজান্তে জাল মুদ্রা বহন করেন বা লেনদেন করেন এবং সেটি প্রমাণিত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা যাবে না বা মামলাও করা যাবে না। কোন ব্যক্তির কাছে সর্বোচ্চ ১০ পিস জাল নোট পাওয়া গেলে মামলার বাইরে বিকল্প পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করা যাবে। তার বেশি পাওয়া গেলে মামলা করতে হবে। বেশি নোট পাওয়া গেলে বেশি শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে এবং ওই আইনে দায়ের করা মামলা আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য। তাছাড়া নতুন আইনে জাল নোট বিষয়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মামলা করতে পারবে। এতোদিন শুধু পুলিশ জাল মুদ্রার মামলা করতে পারতো। আবার কারো কাছে জাল মুদ্রা থাকলেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। ওই জাল মুদ্রার বাহক আত্মপক্ষ সমর্থন বা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাবেন। বাহক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি সরল বিশ্বাসে ওই মুদ্রা বহন এবং বৈধ লেনদেনের অংশ হিসেবে ধারণ করেছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা হবে না। তবে জাল মুদ্রার বাহক যে উৎস থেকে ওই মুদ্রা পেয়েছেন, তাকেও একই বিষয় প্রমাণ করতে হবে। তবে অবশ্যই সেক্ষেত্রে জাল মুদ্রার সংখ্যা ১০ পিসের কম হতে হবে। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও পৌরসভার কাউন্সিলর, প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক বাহকের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর ১০ পিসের বেশি জাল মুদ্রা কারো কাছে থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে।
সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত বছরের জুনে মতামতের জন্য দেয়ার পর আইনের খসড়ায় নতুন করে আরন্ ২৪টি ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। ত্র মধ্যে ধারা ১৪-তে বর্ণিত অপরাধগুলো আমলযোগ্য, শাসিবতর ক্ষেত্রে জাল মুদ্রার সংখ্যা ও ধাপওয়ারি শাস্তি বিবেচনায় না নিয়ে বিজ্ঞ আদালতের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হবে। তবে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। মামলা হলেই আসামি অ-আপসযোগ্য ও অজামিনযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। আর মামলা তদন্ত ৬০ কার্যদিবসের পরিবর্তে ৯০ কার্যদিবস এবং অনধিক ৩০ কার্যদিবসের পরিবর্তে ৪৫ কার্যদিবস পর্যন্ত সময় দেয়া হবে। বর্তমানে অনুসৃত আইনের আওতায় জাল নোট সংক্রান্ত অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তার মধ্যে শুনানির দিনে সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় মামলা কার্যক্রমে বিঘœ, জাল নোট বাহক অনেক সময় নিরপরাধী হওয়া, জাল নোটের সংখ্যা অল্প হলেও কঠিন শাস্তি ভোগ এবং জাল নোট প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা অন্যতম। ওসব সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যেই একটি পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তার আগে খসড়া প্রণয়নে ৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।
সূত্র আরো জানায়, খসড়া আইনে শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যতো বেশি নকল মুদ্রা তৈরি বা সরবরাহের অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার দ- ততো বেশি হবে। আইনের খসড়া অনুযায়ী, যে কোন মূল্যের ১০০টির কম জাল মুদ্রা পাওয়া গেলে দুই বছর কারাদ- বা অনূর্ধ এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। জাল মুদ্রার সংখ্যা ১০০টির বেশি কিংবা ৫০০টির কম হলে ৫ বছর কারাদ- বা অনূর্ধ ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। কোন ব্যক্তি ওই আইনে দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে দ- বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ১০০টির কম জাল মুদ্রার জন্য ৫ বছর কারাদ- বা অনূর্ধ ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। জাল মুদ্রার সংখ্যা ১০০টির বেশি কিংবা ৫০০টির কম হলে ৭ বছর কারাদ- বা অনূর্ধ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। আর ৫০০টির বেশি হলে ১২ বছর কারাদ- বা অনূর্ধ ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ে দ-িত হবে। কোন ব্যক্তি আইনের ধারায় তৃতীয়বার বা তার চেয়ে বেশিবার অপরাধী প্রমাণিত হলে শাস্তি আরো বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ১০০টির কম জাল নোটের জন্য ১০ বছর কারাদ- বা অনূর্ধ ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। জাল নোটের সংখ্যা ১০০টির বেশি কিংবা ৫০০টির মধ্যে থাকলে ১২ বছর কারাদ- বা অনূর্ধ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। আর ৫০০টির বেশি জাল মুদ্রার জন্য যাবজ্জীবন কারাদ- বা অনূর্ধ এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। খসড়া আইনে জাল নোটের বিষয়ে তথ্য দিলে পুরস্কারের কথাও উল্লেখ আছে। তাতে বলা হয়েছে, জাল মুদ্রা প্রস্তুত, ধারণ, বহন, সরবরাহ, আমদানি-রফতানি এবং মুদ্রা প্রস্তুতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিসহ আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদি সম্পর্কে তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সরকার পুরস্কৃত করবে।
এদিকে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মোঃ আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন-২০২১’ খসড়া চূড়ান্ত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), র‌্যাব, পুলিশ, এনএসআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন। জাল নোট বহন, প্রচলন ও বিস্তারের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে দেশে বর্তমানে সুনির্দিষ্ট কোন আইন নেই। ফৌজদারি দ-বিধি ১৮৬০ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর আওতায় বর্তমানে জাল নোটের মামলা ও বিচার সম্পন্ন হয়। জাল নোটসহ যাদের ধরা হয় তাদের অনেকেই সাধারণ মানুষ। তাদের আইনি ঝামেলায় পড়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। তাছাড়া সাক্ষীর অভাবে বিচারও বিলম্বিত হয়। এসব কারণে নতুন আইন করা হচ্ছে।
ওই সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কেন্দ্রীয় ব্যাংক) এ বি এম রুহুল আজাদ বলেন, খসড়া আইনের ওপর সংশ্লিষ্ট বিভাগের মতামত পাওয়া গেছে এবং তা যুক্ত করা হয়েছে। তার বাইরে সর্বশেষ জননিরাপত্তা বিভাগ, সিকিউরিটি এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাণিজ্য, শিল্প ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত মতামত বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক কে এম ইব্রাহীম বলেন, আলোচ্য আইনের খসড়ায় মোট ২৪টি ধারা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সব ধারার মাধ্যমে জাল মুদ্রা প্রতিরোধে সামগ্রিক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।  সূত্র: এফএনএস২৪

Leave A Reply

Your email address will not be published.